৭৩ পেরিয়েও অ্যালবার্ট হলের শিরদাঁড়া এখনও টানটান

797

রেখেছো বাঙালি করে, আর আড্ডা দিমুনি? এও কি হয়? কথায় বলে চারজন বাঙালি একজায়গায় হলেই আড্ডা শুরু হয়ে যায়। সেই আড্ডায় সানি লিওন থেকে মান্না দে-সকলের অবাধ যাতায়াত। সৌরভকে ব্যাটিং বা প্যারামাউন্টকে শরবত বানাতে শেখানো হয় এই সমস্ত আড্ডায়। কিন্তু সেই আড্ডাগুলো হারিয়ে যায়। এবার আর হারাবে না। কারণ, তোমাদের আড্ডাকে আমরা প্রিজার্ভ করে রাখবো ছাপার অক্ষরে। তাই, এবার থেকে যেখানেই যাও, আড্ডা দিতে বসলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে পাঠিয়ে দাও আমাদের মেল আইডিতে। কী নিয়ে আড্ডা হল, তা খানিকটা সেন্সর করে লেখা পাঠাও বাংলা/ ইংরেজিতে। মনোনীত হলে ক্যাম্পাস জুড়ে থাকবে তোমার আড্ডা। সঙ্গে তোমার বন্ধুদের ছবিও।

এই সপ্তাহের আড্ডার বিষয় ভাবতে বসে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল টিম ক্যাম্পাসকে। শহরের নামিদামি আড্ডার ঠেক থেকে আবদারও এসেছিল। কিন্তু ক্যাম্পাস তাদের প্রথম ইস্যুতে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে চায় বাঙালির আদিঅন্তপ্রাণ কফি হাউসকে। তাই এ সপ্তাহে কফির কাপে তুফান তুলতে ক্যাম্পাস সদলবলে হানা দিয়েছিল কফি হাউসে। কী কথাবার্তা চলছে সেখানে, কান পেতে শুনলেন দেবযানী সরকার

বিকেল চারটে৷কফি হাউসের ফার্স্ট ফ্লোরে ঢুকে দেখলাম না যে একটা চেয়ার-টেবিলও ফাঁকা নেই৷ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়ল বাঁদিকের টেবিলে দু’জন টিনএজার মেয়ে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে৷কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রায়ই কি কফি হাউসে আসা হয়? উত্তরে ওরা জানাল, সপ্তাহে অন্তত তিন-চারদিন ওরা এখানে আসে৷

পরের প্রশ্ন ছিল, তোমরা কি এই চত্বরের কোনও কলেজে পড়ো?

উত্তরে অনিন্দিতা জানাল, ও সল্টলেকে আরবিইউ- এর ক্যাম্পাসে পড়ে৷ প্রিয়ংবদা জানালো, ও বিএড করছে বারাসতের একটা কলেজ থেকে৷এদের কারোর বাড়িই কলেজ স্ট্রিট চত্বরের ধারেকাছেও নয়৷ অনিন্দিতার বাড়ি ব্যারাকপুর আর প্রিয়ংবদার বাড়ি কাঁকিনাড়া৷

স্বাভাবিকভাবেই ওই দুজনের কাছে আমার পরের প্রশ্ন ছিল, গরমে ‘সিসিডি’র মত এসি হ্যাংআউট ছেড়ে এই আদি কফি হাউসে কিসের টানে? যেখানে প্রতি দুমিনিটের মাথায় পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছতে হয়? আর তার ওপর বাড়ি থেকে এত দূরে?

প্রশ্নটা শুনেই বেশ কিছুটা নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ল দুজনে৷ বলল, কি বলছ! প্রান খুলে আড্ডা মারার জন্য বাঙালির কাছে এর থেকে ভালো জায়গা আর আছে নাকি? গরম, ডিসট্যান্স-এগুলো জাস্ট আমাদের কাছে কিছু ম্যাটার করে না৷ আমরা প্রায় দুবছর ধরে নিয়মিত এখানে আসি। কারন, এই জায়গাটা আমাদের কাছে খুব ফ্রেন্ডলি লাগে৷ক্যাফেটেরিয়াগুলোর মত এখানে কোনও প্রিটোন নেই৷ এছাড়াও, এখানে খাবারের দামও খুব কম৷ একদম পকেট ফ্রেন্ডলি৷আর অনেস্টলি স্পিকিং, এখানে স্মোক করা যায় যেটা ক্যাফেটেরিয়াতে করা যায় না৷ আমরা মনে করি, হাতে কোনও কাজ নেই মানেই, লেটস গো টু কলেজ স্ট্রিট৷

অনিন্দিতা-প্রিয়ংবদাই ওদের পাশের টেবিলের দিকে দেখিয়ে বলল, ওই যে ওদের দেখছ, ওরা তো প্রতিদিন এখানে আসে আর প্রায় সারা দিনই এখানে কাটায়৷

কফি হাউসকে ঘিরে জেন ওয়াই এর ইমোশন কতটা তা জানতেই যখন মূলত আমাদের সেখানে যাওয়া, সেক্ষেত্রে ওই টেবিলটাকে এড়িয়ে যাই কিভাবে! অগত্যা গেলাম৷গিয়ে জানতে পারলাম, এই টেবিলটা নাকি অন্য কারও দখলে ওরা যেতেই দেয় না৷ প্রায় কফি হাউস খোলা থেকে বন্ধ পর্যন্ত ওদের একের পর এক গ্রুপ এই টেবিলটায় আড্ডা দেয়৷তবে সব গ্রুপে প্রায় কমনম্যান যে, সেই পীযুষ( ফেসবুকে ইংরেজিতে অবশ্য লেখে পিয়ুস বানান) গায়েন আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র৷বাড়ি বালিতে৷ সে বললে, আমি ক্লাস টেন এ পড়ি যখন, তখন থেকে এখানে আসছি৷ক্যাফেটেরিয়া কদিনের? এই তো কদিন আগে জন্মালো৷ ওখানে জমিয়ে আড্ডা হয় নাকি? তাছাড়া আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সিসিডি কিংবা কেএফসি তে রেগুলার যাওয়া সম্ভব নয়৷ওদেরই বান্ধবী রিয়ার কথায়, কফি হাউসে সবকিছু খুব ন্যাচারাল৷গরমে এখানে খুব একটা কষ্ট হয় না তার কারন, এর হাইটটা ৪০ ফিট৷ coffee

এরপর সেকেন্ড ফ্লোরে উঠে গিয়েও সেই একই ছবি চোখে পড়ল৷সব টেবিলই ভরতি৷ এক্সট্রিম কোনায় টেবিলে দেখলাম একটা ছেলে-মেয়ে সেলফি তুলছে৷ওদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ওরাও কলেজের গণ্ডি পেরোয়নি৷ইংলিশ অনার্সের আত্রেয়িও কফি হাউসে আসার ব্যাপারে অন্যদের সঙ্গে একমত৷ বলল, এখানে আসি তার কারণ, এখানে কোনও এটিকেট নেই৷ এখানে মেপে হাসতে হয় না৷মন খুলে গসিপ করা যায়৷আর ওখানে তো একশ টাকার খেলে প্রায় কুড়ি টাকার ট্যাক্স দিতে হয়৷ এখানে তো ওসব নেই৷ আত্রেয়ির বন্ধু দীপ বললে, সত্যি বলতে কি আমরা কফি হাউসে আসি কিছু মেমোরিস তৈরি করতে৷চাকরি পেলে আমরা তখন আর সবাই মিলে এইভাবে আড্ডা মারতে পারবো না৷ কে কোথায় থাকবো জানি না৷আমরা ঠিক করেছি, আমরা ভবিষ্যতে মিট করলে কফি হাউসেই করব৷তারপর সবাই এরসঙ্গে স্মৃতিচারণ করব৷

এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে একটা কথা বোঝা গেল যে, উদার অর্থনীতির হাত ধরে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাফেটেরিয়াগুলো এখনও কফি হাউসের কৌলিন্যকে এতটুকুও ছুঁতে পারেনি৷আরও স্পষ্ট হল কফি হাউসের এক কাউন্টার কর্মীর সঙ্গে কথা বলে, তিনি জানালেন, হট, কোল্ড মিলিয়ে প্রতিদিন কমবেশি দুই থেকে আড়াই হাজার কফি বিক্রি হয় এই গরমেও৷কফির পর রেকর্ড বিক্রির লিস্টে আছে স্যান্ডুইচ, কাটলেট, পকোড়া৷শুনে বেশ ভালো লাগলো যে, এই আড্ডার ঠেকে এখনও প্রায় ৬০টি খাবারের আইটেম পাওয়া যায়৷

বাঙালির ইন্টেলেকচুয়াল বিলাসের সঙ্গে বরাবরই কফি হাউস জড়িয়ে৷ বাঙালির এই আড্ডার ঠেক টিনএজ হোক কিংবা সিনিয়র সিটিজেন, সকলের কাছেই মোস্ট ফেবারিট৷সত্যজিৎ রায়, মৃনাল সেন, অমর্ত্য সেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়, কার পদধূলি পরেনি এখানে! ১৯৪২ থেকে ২০১৫৷৭৩ বছর বয়সে সেদিনের অ্যালবার্ট হলের শিরদাঁড়া এখনও টানটান৷

শুধু মাত্র কলেজ স্ট্রিট চত্বরের পড়ুয়াদেরই নয়, এলাকার গণ্ডির বাইরেরও বহু ছাত্রছাত্রীকে কাছে টেনেছে সেকেলে কফি হাউস৷এখানে আসলেই দেখা যায়, এই একই ছাদের তলায় পাশাপাশি টেবিলে বসে সত্তোরোর্ধদের সঙ্গে আড্ডায় পাল্লা দিচ্ছে জেনারেশন ওয়াই৷মার্ক্স থেকে মমতা, সত্যজিৎ থেকে সৃজিত৷ সপরিবারে পুরী বেড়ানোর গল্প থেকে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে লিভ ইন৷এটিকেট, ব্যকরণের তোয়াক্কা না করেই যে কোনও বিষয়েই তুমুল আলোচনার ঝড় বইছে প্রতি মুহূর্তে৷কারোরই কাউকে দেখে না সিটকানো বা ভ্রু কুঁচকানোর ব্যাপার নেই৷ সত্যি, সোশিও-ইকোনমিক চেঞ্জের পরও কফি হাউসের আড্ডার ছবিটা আজও একইরকম৷ এতকিছুর পর এটাই মনে হয় যে, কলকাতার এই একমাত্র জায়গায়টাই “জেনারেশন গ্যাপ” দুটো শব্দকে জাস্ট পাত্তা দিল না৷