ভাষা নিয়ে ভাসছি কোথায়!

477

manashiমনের কথা বোঝাতে মানুষের আছে ভাষা৷ তবু নিজেকে আর একজনের কাছে বুঝিয়ে উঠতে পারে না সে৷ যে নিজেকেই বুঝতে পারে না সে অন্যের ভাষা বুঝবে কী করে? গরুর ভাষা, কুকুরের ভাষা, পাখির ভাষা..মানুষ কোনওদিন বুঝেও দেখল না৷ বলা ভালো বোঝার চেষ্টাও করল না৷ অথচ তারা তো মানুষের ভাষা বোঝে? তবে কি ভাষা নিয়ে আদৌ এগোচ্ছে মানুষ? উত্তর খুঁজলেন মানসী সাহা

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে জোয়া আখতারের ছবি ‘দিল ধড়কনে দো’। যেখানে মেহেরা পরিবারের গল্প শুনিয়েছে তাঁদের পোষ্য প্লুটো। শান্ত এই কুকুরটি মুখে কিছু না বলেও জানিয়ে দিয়েছে, চিরন্তন সেই সত্য। এতো শব্দ এতো কথা থাকতেও মানুষ কতটা অসহায় তাদের মনের কথা বোঝাতে। আর এই বোঝা না বোঝার পাল্লায় বাড়ছে ঝগড়া, হচ্ছে মনোমালিন্য। আমরা যারা নিজেদের উন্নত জীব বলে মনে করি সত্যিই কি আমারা উন্নত? আজ চাঁদে পাড়ি দিচ্ছি আমারা। কিন্তু মানুষের মনের দরজার তালাটা আজও খুলতে শিখিনি। হাজারও শব্দ থাকা সত্ত্বেও আজ আমরা ‘বোবা’, ভুল বোঝাবুঝির পাহাড়প্রমাণ চাপ আমাদের ঘাড়ে। নিজের ইচ্ছা, নিজের দাবী, নিজের স্বপ্ন আমরা নিজেরাই প্রকাশ করতে পারি না, তো অন্যদের মনের কথা বুঝব কী করে? তাও আবার যারা মানুষের মতো কথা বলতে পারে না৷

মনের ভাব প্রকাশের ইচ্ছা একদিন মানুষকে কথা বলতে শিখিয়ে ছিল। আজ এই ভাষাই নিয়ে এসেছে বিপত্তি। নিজের মনের কথা তো আমারা বোঝাতে পারিইনি, উপরন্ত এই ভাষা সৃষ্টি করেছে বিদ্বেষেরও। আমি বাংলায় কথা বলি আমি বাঙালি, আমি গুজরাটি, আমি আসমীয় আমি অ্যাংলো। কবির কথা ‘ নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’। তবে একটাই আক্ষেপ কবির স্বপ্ন ‘বিবিধের মাঝে মিলন মেলা’ আজও স্বপ্নই থেকে গেল।

তবে আমাদের চোখে যারা আনুন্নত জীব তারা কিন্তু দিব্যি আছে। একটি শব্দের জন্ম থেকে মৃত্য পর্যন্ত মনের ভাব, রাগ, দুঃখ, সুখ, মান-অভিমান প্রকাশ করে চলেছে। শুধু নিজেদের নয় মানুষের কথাও তারা বুঝতে পারে। হাত নেড়ে যখন কুকুড় বা বেড়ালটিকে আমরা ডাকি ল্যাজ নাড়তে নাড়তে সে কাছে চলে আসে। কিন্তু আমারা ওদের কথা বুঝি না। ভাবতে অবাক লাগে আমারা নাকি পাখির আওয়াজ নিয়ে কবিতা লিখি। আর সেই পাখিকেই বন্দি করে রাখি খাঁচায়। হ্যায়! আমরা কি বুঝি না ওর ঠিকানা খোলা আকাশে। নাকি বুঝেও না বোঝার ভ্যাব। নাকি সভ্যতার অহংবোধ আমরা ক্ষমতাবান বলেই অবজ্ঞা করি পাখির ভাষাদের? বলা ভালো, মনুষ্যেতর জীবের ভাষাদের?

এই প্রসঙ্গে সবথেকে ভালো উদাহরণ গরু। যখন মানুষ কথা বলতে পারতো না, হাত পা নেড়ে অঙ্গ-ভঙ্গির মাধ্যমে কিংবা মুখে বিভিন্ন রকম আওয়াজ করে তাঁদের মনের ভাব প্রকাশ করত, সভ্যতার সেই আদি লগ্ন থেকে মানুষের সঙ্গে রয়েছে এই প্রানীটি। কিন্তু আমারা তাঁর ভাষা বুঝি না। পরিবর্তনের স্রোতে আমরা কথা বলতে শিখেছি। কিন্তু সে তো দাঁড়িয়ে সেই হাজার বছর আগেই। এখনও তার সহায় একটা শব্দই৷ রাগ, সুখ, দুঃখ বোঝানোর ‘হাম্বা’। কিন্তু চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকলেও, আমরা মানুষেরা পোষ্যের এই আওয়াজ শুনে কিছুই বুঝতে পারি না। কি তার চাহিদা? কি বা তার আবদার? তাইতো তিন বেলা খাবার দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে মানুষ-গরুর সম্পর্ক। সে কারণে মা গাভিটি যখন ‘হাম্বা’ বলে তার বাছুরটিকে তার কাছে ডাকে। আর ছোট গো-ছানাটি যখন লেজ নাড়িয়ে লাফাতে লাফাতে মায়ের দিকে ছুটে যেতে চায়, তখন সেই স্নেহের ডাক উপেক্ষা করে আমারা বাছুরটিকে বেঁধে রাখি খুটির সঙ্গে। মায়ের দুধের উপর যেন তাঁর অধিকার নেই। কিন্তু ধরে নেওয়া যাক, আজ যদি গরু ‘হাম্বা’ না বলে, আমাদের মতো কথা বলতে পারতো, যদি সে ডাকত ‘আয় খোকা আয়’, তখন কি উপেক্ষা করতে পারতাম আমরা তার সেই ডাককে। কিংবা যদি একদিন সকালে উঠে, আমরা দেখি গরুরা সব কথা বলছে। গোয়াল ঘর থেকে চিৎকার করে বলছে, আমদের ছেড়ে দাও। কেন দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে আমাদের? তখন? তখন কি করতাম আমরা নিরুপায় হয়ে কি ছেড়ে দিতাম তাদের?

তবে তারা অসহায়। নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না, আমাদের মতো উন্নত জীবের কাছে। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘নির্বাক’ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন এই অসহায়তা কোন মাত্রার৷ স্রেফ ভাষা নেই বলেই ভাষাবলে বলিয়ান মানুষকে একটি কুকুর তার হৃদয়ের আবেগ, প্রেম জানাতে পারল না৷ এইই বাস্তবতা৷ কিন্তু কে বলতে পারে, একদিন অবুঝ এই মনুষ্য জাতিকে তাদের কথা বোঝানোর তাগিদে একদিন কথা বলতে শিখবে না তারা? তবে আমরা না বুঝতে পারলেও গো-কুল কিন্তু নিজের ভাষা খুব ভালো করেই বোঝে। তারা তাদের প্রেমের প্রকাশ ঘটায়, আদরের আপ্লুত হয়, ভীতি প্রদর্শন করে ওই একটি শব্দে ‘হাম্বা’। তাইতো কামাসক্ত গাভি তার সঙ্গীটি-কে ডাকে ‘হাম্বা’ বলে। প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করে, সে যখন তার সদ্যজাত সন্তানটিকে দেখে স্নেহে বিগলিত হয়ে তাঁর মুখ থেকে বার হয় ‘হাম্বা’। আবার যখন চোরা চালান-কারিদের হাতে পথে চলতে চলতে গভীর অন্ধকারে খুরের আওয়াজ তুলে নিঝুম রাতে ভয় পায় তখনও আর্তনাদ করে ওঠে ‘হাম্বা’ বলে। এক শব্দ ভাব অনেক।

তবে শুধু গরু নয়। সমস্ত জীব কূলের একটাই শব্দ যা দিয়ে তারা তাদের মনের সব ভাব গুলি প্রকাশে সক্ষম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই একটি শব্দের মাধ্যমে তারা তাদের জীবনটা সুখেই কাটিয়ে দেয়, পৃথিবীর সব থেকে সুখী প্রাণী হিসাবে। আর আমরা মানুষেরা হাজারেরও বেশি শব্দ প্রয়োগ করে এখনও মাঝে মাঝে নিজের মনের কথা বোঝাতে অক্ষম। জড়িয়ে পড়ি নানা কলহে। শব্দবানে জর্জরিত করি নিজেকে-অন্যকে। তাইতো আজ আমরা মানুষেরা পৃথিবীর সব থেকে হিংস্র জীব রূপে গণ্য হই। ভাষা আমাদের বাহন ঠিকই, কিন্তু সভ্যতার কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে এসে প্রশ্ন জাগে, ভাষা নিয়ে আমরা কি আদৌ কোথাও পৌঁছচ্ছি? নাকি ভাষা নিয়েও আমরা ক্রমাগত হেরে যাচ্ছি ভাষাহীনদের কাছে? উত্তর মেলে না৷ উত্তরের মতো ভাষাও বোধহয় নেই আমাদের কাছে৷