ম্যাগি ম্যানিয়া: সুইস কারখানা থেকে বাঙালির হেঁসেল জয়

857

সাধের দু মিনিটের ম্যাগির উপর কি না সেন্সরের কাঁচি? মানছি না মানব না! সেই কোন মেয়েবেলা থেকে বড় annyatamaহয়ে ওঠা ম্যাগির সঙ্গে। ‘মেরি ম্যাগি’র সবথেকে বড় বিজ্ঞাপন আমিই লিখতে পারি। ক্যাম্পাসের পাতায় ম্যাগির জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা তুলে আনলেন অন্যতমা দাস। 

হঠাৎ করে গোটা দেশ জুড়ে ত্রাহি ত্রাহি রব৷ কি, না ম্যাগিতে অতিরিক্ত পরিমাণে সীসা মিলেছে৷ সে কারণে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে জনপ্রিয় এই চটজলদি দুমিনিটের নুডলস৷ এ কথা প্রথম খবরের কাগজে পড়তেই চোখ কপালে ওঠার যোগাড়৷ যবে থেকে দুধের দাঁত একটু পোক্ত হয়েছে, তবে থেকেই তো ম্যাগি খাচ্ছি৷ বেশিরভাগই দিনই দুধ-রুটির বদলে মাকে বলেছি, “ম্যাগি করে দাও”৷ বছর কুড়ি ম্যাগি খাওয়ার পর কী না সাধের নুডলসে টান পড়ল? কি মাথায় ভূত চাপল, ভাবলাম ম্যাগির ইতিহাসটি একটু নাড়াচাড়া করে দেখি৷ অনেকটা দাঁত হারিয়ে তার মর্ম বোঝার মত আর কি!  ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতেই ম্যাগির অনন্য কীর্তি চোখের সামনে উঠে এল৷ এতদিনের ইতিহাস কি না এক লহমায় ধুলোয় মুছে যাবে?

সরকারি নির্দেশই ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়৷ সালটা ১৮৭২, জায়গা সুইজারল্যান্ড৷ জুলিয়াস ম্যাগি খুঁজে বেড়াচ্ছেন কিভাবে চটজলদি পুষ্টিকর খাবারের রেসিপি৷ কারণ সুইস সরকারের নির্দেশ, মহিলার বেশিরভাগ সময়েই বাইরে কাজ করেন৷ অনেকে আবার বলছিসেন সরকারি কর্মীরা যাতে কাজে ফাঁকি দিয়ে খাবারের পিছনে বেশি সময় নষ্ট না করে সেই কারণেই এমন সরকারি নির্দেশ জারি হয়েছিল৷ তাই এমন খাবার বানাতে যা বেশি সময় নেবে না আবার পুষ্টিকরও হবে৷ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আবিষ্কার ম্যাগির রেসিপি৷ যদিও সেসময়, নুডলস নয়, ম্যাগি ছিল কেবলই ‘ফ্লেভার’৷

জানা যায়, ১৮৭২ সালেই বাবার মিলের কাজ দেখাশোনা করার দায়িত্ব পড়ে জুলিয়াসের হাতে৷ খুব অল্প সময়েই মধ্যেই বিখ্যাত ফুড প্রোডাকশন গড়ে তোলেন তিনি৷ ম্যাগির ফ্লেভার আবিষ্কার করার পরেই জার্মানিতে তিনি নতুন কোম্পানি তৈরি করেন৷ সেটি এখনও সেখানেই আছে৷ নুডলসের আগে ম্যাগি ছিল শুধুই মশলা৷ যা জলে গুলি সহজেই স্যুপ তৈরি করা যেত৷ প্রথম, মরটশুটি, বরবটি-মোট তিন রকমের ফ্লেভারের মশলা বাজারে নিয়ে আসেন জুলিয়াস৷ এর প্রায় বেশ কয়েকবছর পরেই আসে হাতবদলের পালা৷ ১৯৪৭ সালে ম্যাগির ‘রাইট’ কিনে নেয় নেসলে কোম্পানি৷Maggi-annya-fin

তারপরেই ভারতের বাজারে ছড়িয়ে পরে ম্যাগি নুডলস৷ এরপরেই চড়চড় করে জনপ্রিয়তা পায় ম্যাগি৷ শুধু নুডলস নয়, ম্যাগি সস, পরে ম্যাগি মশলাও বাজারে বিকোতে শুরু করে হু হু করে৷ ভারত ও মালেশিয়ায় ম্যাগির জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া৷ ম্যাগির মতো সমসাময়িক আরও অনেক নুডলস বাজারে এলেও ‘ম্যাগি’ নামটার সঙ্গেই ইনস্ট্যান্ট নুডলসের যোগসূত্র তৈরি হয়ে এক অদ্ভূত ভাবে৷

বাজারে অন্যান্য সংস্থার হরেক রকম স্বাদের নুডলস এলেও এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গোটা ভারতে ইনস্ট্যান্ট নুডুলসের প্রায় ৬০ শতাংশ বাজার একলা ধরে রেখেছে ম্যাগি৷ শুধুমাত্র নুডুলসই নয়, ম্যাগির প্যাকেটে যে মশলা দেওয়া হয় সেটিও যেন আলাদা কদর, দিনে দিনে বারতে থাকে ম্যাগির চাহিদা৷ সালটা ১৯৮২৷ ম্যাগির জন্য প্রচারিত হল নতুন স্লোগান৷ ‘২ মিনিট নুডলস’ নাম দেওয়া হয়েছিল সে সালেই৷

গড়পড়তায় দেখতে গেলে স্বাধীনতার বছর থেকেই ভারতের মানুষ ম্যাগি খেয়ে আসছে৷ সেই হিসেবে দেখলে প্রায় ৬৮ বছর ধরে ভারতের বাজারে ম্যাগির রমরমা৷ ইতিহাসটা পড়েই একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করল৷ ৬৮ বছর ধরে কারুর খেয়াল হল না এই খাবারে সীসা রয়েছে? সেই ১৯৪৭ সালের পর হঠাৎ আজ দেশের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটির মনে হল এটি ক্ষতিকর? 

ম্যাগির প্রথম বিজ্ঞাপন
ম্যাগির প্রথম বিজ্ঞাপন

যদিও এখনও পর্যন্ত কোনও ডাক্তারই বোধহয় মৃত্যু কারণ হিসেবে ম্যাগিকে দায়ি করেননি৷ ম্যাগি ক্ষতিকর কি না তা আমার অবশ্যই জানা নেই৷ কিন্তু প্রশ্ন এতদিন দেশের হর্তাকর্তা বিধাতারা চোখ বুজে ছিলেন? আবার আর একটা কথাও মনে হচ্ছে, ম্যাগি টেক্কা দেওয়ার জন্য ম্যাগির বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার কি? তবে সে যাই হোক আমরা যারা অ্যাত্তোদিন ধরে ম্যাগি খাচ্ছি তারা ম্যাগি কে ভুলব না কোনও দিনই৷ ‘মেরি ম্যাগি’র স্বাদ আমাদের জিভেই চিরকালই অমলিন হয়েই থাকবে৷