ফিরিয়ে দাও ‘মাই ম্যাগি’

483

‘এমনি নানা স্মৃতির সাথে জড়িয়ে চিরদিন…’ সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক বোরোলীনের এ বিজ্ঞাপনী ভাষা অনায়াসে ব্যবহার করা যেতে পারে ম্যাগির জন্যও৷ আজ সে নিষিদ্ধ৷ কিন্তু ছোটবেলার টিফিন হোক কিংবা প্রেমিকার গিন্নিপনা, সাংবাদিকতার চড়াই-উতরাই কিংবা নেহাত টিফিন-ম্যাগি যেন কবে থেকে হয়ে গিয়েছে বঙ্গজীবনের অঙ্গ৷ কর্পোরেটের খেলে সে নিষিদ্ধ বটে, তবে স্মৃতির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপাবে কে? গিয়েছে যে দিন, সবই তো যায় না৷ মনের জানালা খুলে স্মৃতির সেই ক্যাম্পাসে উঁকি দিলেন দীপেন্দু পাল

dipendu-paul

আপার-প্রাইমারিতে ভরতি হওয়ার কথা মনে আছে ভালোই। আমাদের বাংলা মিডিয়াম স্কুল শুরু হত ভোর সাড়ে ছটায়। সাড়ে আটটা নাগাদ টিফিন। ঘণ্টা বাজলেই একছুট্টে ক্লাসরুমের বাইরে। একে সরকারি স্কুল, তার উপর বাংলা মিডিয়াম। নিয়মের কড়াকড়ি কম। টিফিন টাইমে স্কুলের দোতলায় লম্বা বারান্দার জানালা দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম বাইরে দিকে। কখন বাপি আসবে? বাপি মানে বাবা। বাড়ির পাশেই স্কুল। মায়ের হাতে বানানো টিফিন নিয়ে আসত আমার জন্য। স্কুলগেটের বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিত গরম টিফিন বাক্সটা। ক্লাসরুমে নিয়ে গিয়ে খোলার আগে প্লাস্টিকে জড়ানো বক্সের গায়ে একটা ছোট্ট খোপে কাঁটাচামচ লাগানো দেখলেই বুঝতাম, আজ মা ম্যাগি বানিয়ে দিয়েছে। নুডলস তো পোশাকি। টু মিনিটস নুডলস৷ দেখতে দেখতে ম্যাগি নামেই পরিচিতি। ঠিক যেমন জেরক্স৷ উষ্ণ সরু মশলাদার নুডলসে কাঁটা গেঁথে সুড়ুৎ করে টেনে নেওয়া টিভির বিজ্ঞাপন দেখেই শেখা। বেঞ্চে পাশের বন্ধু রাজু আদক জিজ্ঞেস করত, আজ কী এনেছিস রে? গর্বভরে বলতাম, ম্যাগি। আর পাঁচটা ক্লাস-বন্ধু যখন স্কুলের ক্যান্টিন থেকে চিড়ে বা মুড়িমাখা, নইলে গেটের বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে আলুকাবলি কিনে খেত, আমি তখন ক্লাসরুমে বসে টিভিতে দেখানো ম্যাগি খাচ্ছি, ভাবাটাই ছিল কলার তোলার মতো ব্যাপার।

একবার ডেঙ্গি হল। তুমুল জ্বর, বমি বমি ভাব নিয়ে মৌলালির কাছে এক নার্সিংহোমে ভরতি। কোনও খাবারদাবারই মুখে রুচছে না। বাড়ির জন্য মন-কেমন। খালি মাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। চার দেওয়ালের মধ্যে যেন বন্দি। সকাল-বিকেল মা আসে। আঁচলে মুখ গুঁজে খানিক স্বস্তি। নার্সিংহোমের কড়া নির্দেশ, বাড়ি থেকে খাবার আনা যাবে না। কিন্তু প্রায় কিছুই খাচ্ছি না দেখে, শেষ পর্যন্ত ডাক্তারবাবুকে রাজি করানো গেল। বাড়ি থেকে এল মা-র হাতে বানানো গরমাগরম মশালা ম্যাগি। উইথ ডিম। ডাক্তার সেদিন শুধু বলেছিলেন, “ম্যাগির ওই প্যাকেট মশলাটা একটু কম দেবেন। এই সময় বেশি মশলা খাওয়া ভালো নয়।’’ maggi-2

জাম্প কাট টু ২০১৪। প্রেয়সীর সঙ্গে নিত্য কথা। সংসার পাততে হবে। বকম বকম চলছেই। বাঙালি যুগলের ‘সখী ধরো ধরো’-সুলভ ন্যাকা ন্যাকা কথার বন্যা। প্রেমিকা এক রাতে জানতে চাইল, ‘‘আমি কিন্তু রান্না পারি না। তোর মা যদি রোজ না রাঁধতে চায়?” মুহূর্ত দেরি না করে উত্তর, তাতে কী হয়েছে? আমি ম্যাগি বানাব! সবাই মিলে একসঙ্গে খাব!

চাকরিতে ঢুকে বুঝলাম, সাংবাদিকতার পেশায় খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মটা বাঁধা গৎ। অফিসের ডাক পড়লে সকাল সাতটায় খালি পেটেও ছুটতে হতে পারে। আবার কোথাও আগুন লাগলে, ঘটনাস্থলে গিয়ে রাতভর গনগনে আঁচের সামনে দাঁড়িয়েও থাকতে হতে পারে। বিষয়টির সঙ্গে ধীরে ধীরে একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু সেই বদভ্যাসে ভরসা হল ঘুরেফিরে সেই ম্যাগি-ই। অফিসের মাইক্রোওয়েভে চট করে জলভরতি বাটিতে ম্যাগি চাপিয়ে দিতে পারলেই নিশ্চিন্তি। একটা সিগারেট শেষ হওয়ার আগেই ‘রেডি টু ইট’। maggi-1

এহেন সাচ্চা ম্যাগিপ্রেমীর কাছে প্রায় দেশজুড়ে ম্যাগি নিষিদ্ধ হওয়াটা বিনা মেঘে বাজ পড়ার থেকে খানিকটা কম কাঁপুনির হলেও বড়সড় দুঃসংবাদ বটেই। ম্যাগির বদলে টপ র‍্যামেন, ইয়িপ্পি ট্রাই করে দেখেছি। মন ভরেনি। আচ্ছা, ম্যাগি কেন খাব না বলতে পারেন? খবরে প্রকাশ, ম্যাগিতে রয়েছে এমন কিছু উপাদান, যেগুলি নাকি শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাহলে এতদিন খেলাম যে, অপোজিট রি-অ্যাকশান তো আগেই হওয়ার কথা। হল না কেন?

মোদ্দা কথা, ম্যাগি খাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার পিছনে আমার এবং আমার মতো অনেকেরই একটা অকাট্য যুক্তি চাই। গোটা দেশে ম্যাগি নিষিদ্ধ হলে ফুটপাতে বিক্রি হওয়া খাবার-দাবার থেকে শুরু করে পিৎজা, বার্গার, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বিপণির কাচে মোড়া দশদিনের বাসি স্যান্ডুইচ বিক্রিও নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। মদ, গুটখা, খৈনিতেও নিশ্চয় শরীরে প্রোটিন-ভিটামিন ঢোকে না। তাহলে কেবল খাঁড়া কেন ম্যাগির উপর? তাহলে কি ম্যাগির কোনও বড়সড় প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারে আসতে চলেছে? আরও বড় কোনও সংস্থা? কোথাও বসে কি এ নিয়ে স্বাক্ষরিত হয়েছে কোনও গোপন ‘মউ’? নাকি পিছনে রয়েছে অন্য কোনও খেল?

সীসা, কার্বন-মনোক্সাইডের বিষ-জ্ঞান যাঁরা দিচ্ছেন দিন, আমার ও আমার মতো এই প্রজন্মের আরও লক্ষ লক্ষ ছুটন্ত তরুণ-তরুণীর একটাই জিজ্ঞাস্য, ম্যাগি ছাড়া এ জীবন না হয় আমরা কোনও মতে চালিয়ে নিলাম, সপ্তাহান্তের সৌখিন ইটিং-আউটে কেনটাকি ফ্রায়েড চিকেন অথবা সিসিডি-র মতো ব্র্যান্ডেড খাদ্যনালায় ঢুঁ মারা আপনারা বন্ধ করবেন তো?