একজন সফল রেডিও জকি হওয়ার চাবিকাঠি

2980

রেডিও নিয়ে টিনএজারদের মধ্যে একটা ফ্যাসিনেশন থাকেই। রেডিওর গ্ল্যামার ভ্যালুটা অনেকের কাছেই বড় রঙিন। আগামী দিনে রেডিওর জগতে বিনিয়োগ বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ এম-এ সেভাবে না এলেও এফ এম-এ ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে।

রেডিওয় কাজ করতে হলে বা রেডিওকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যত গড়তে হলে তোমাকে আগাম প্রিপারেশন নিতেই হবে। মাইকের সামনে বসে যা-তা বকে যেতে পারলেই ভালো রেডিও জকি হওয়া যায়, এ ধারণা সবার আগে ত্যাগ করো। আর কী কী করতে হবে, সে সবের হদিশ দিতেই তো আজকে হাজির টিম ক্যাম্পাস। সঙ্গে বিশেষ টিপস দিচ্ছেন আকাশবাণী কলকাতার 107 FM Rainbow চ্যানেলের প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ ডঃ মানস প্রতিম দাসগুছিয়ে লিখলেন দীপেন্দু পাল dipendu-paul

রেডিও নিয়ে কেরিয়ার গড়তে চাইলে একটা কনসেপ্ট সবার আগে ক্লিয়ার করতে হবে। রেডিও স্টেশন দু’রকমের হয়। একদম টিভি চ্যানেলের মতো। সরকারি আর বেসরকারি। সরকারি রেডিও স্টেশন বলতে আমাদের দেশে আকাশবাণী। যার প্রায় প্রতিটি শহরেই মিডিয়াম ওয়েভ ও এফ এম স্টেশন রয়েছে। আর বেসরকারি চ্যানেল বলতে বড় বড় গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন এফ এম স্টেশন। এদের মিডিয়াম ওয়েভ নেই, বেশিরভাগই এফ এম।

এখন তোমাকে সকলের আগে ঠিক করতে হবে কোন মাধ্যমে কাজ করতে চাও। এ এম, না এফ এম। কর্মসূত্রে জানি, আশি শতাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর আসে এফ এম। কারণ, অনেকের মতেই মিডিয়াম ওয়েভে বেতার নাকি আজকাল কেউ শোনে না। রেডিওয় কাজ করতে হলে তোমাকে কিন্তু এই ভুল কনসেপ্ট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আজও আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই গ্রামে বাস করেন। তাদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা এফ এম বা ফ্রিকোয়েন্সি মডিউলারের নেই। কারণটা প্রযুক্তিগত। যাই হোক, জেনে রাখো আমাদের দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ গ্রামেই কিন্তু পৌঁছে যায় এ এম বা মিডিয়াম ওয়েভের বেতার অনুষ্ঠান।

এফ এম প্রেজেন্টেশনে টিন এজারদের রোলমডেল যাঁরা: আর জে মীর
এফ এম প্রেজেন্টেশনে টিন এজারদের রোলমডেল যিনি: আর জে মীর

এবার আসা যাক আর একটা কাজের কথায়। রেডিওয় কাজ করা মানেই যে শুধু আর জে হওয়া তা নয়, রেডিও স্টেশনে আরও হাজারটা কাজ থাকে। এফ এম স্টেশনে যারা মূল অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন তাদের অনেকেই বলে রেডিও জকি। আর জে অমুক- আর জে তমুক-এখন তো ভরে গিয়েছে চারিদিকে। এদের অস্তিত্ব থাকলেও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সেটা আলোচ্য বিষয় নয়। আলোচ্য হল তুমি কি করে একজন  আর জে হিসেবে বাড়ি থেকেই নিজের ট্রেনিং শুরু করবে।

১. প্রথম কাজ, রেডিওকে ভালোবাসতে হবে। সব ধরণের রেডিও প্রোগ্রাম শুনতে হবে। এর অনুষ্ঠান ভালো-ওরটা ভালো না বলে শুনি না, বাছ বিচার করলে চলবে না। কারণ, খারাপ অনুষ্ঠান না শুনলে ভালোটার পার্থক্য বুঝবে কী করে? চালু উচ্চারণ-বিধিতে কথা বলতে পারাটা খুব জরুরি।

২. গান-কবিতা আবৃত্তির ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা ভালো। দুটো কারণে। মূল কারণ, এতে গলার মডিউলেশন শেখা যায়। রাগ-রাগিণীর পার্থক্য শেখা যায়। কোথায় গলার স্বর তুলতে হবে, কোথায় খাদে নামাতে হবে তার বাস্তব জ্ঞান মেলে। তবে এই দুইয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া যে কেউই রেডিও জকি হতে পারে না, এটা বললে চূড়ান্ত মিথ্যা বলা হবে। কারণ, বহু সফল জকি রয়েছে যাদের কোনও আগাম ঘরানার শিক্ষা ছিল না। কাজে ঢুকে ও শেখার আগ্রহে তাঁরা শিখে নিয়েছেন কী করে রেডিওর শ্রোতাদের মন বুঁদ করে রাখতে হয়।

আর জে সায়ন
আর জে সায়ন

৩. ইনস্ট্যান্ট বানিয়ে বলার ক্ষমতা রাখতে হবে। থাকতে হবে পর্যাপ্ত নলেজ। কারণ, এখনকার কর্পোরেট যুগে এক একজনকে এক একটা কাজের জন্য রাখা হয় না। একজনকে হতে হবে মাল্টিটাস্কার। তুমি কিশোরকুমারের গান শোনও বলে অসমের বিহু নাচ নিয়ে দু-চার কথা জানবে না, বললে কিন্তু চলবে না। আগামী দিনে প্রাইভেট এফ এম স্টেশনে খবর পড়ার অনুষ্ঠান বাড়বে। তাই খবরটা জানতেই হবে। দেশে-বিদেশে-খেলায়-সিনেমায় কী ঘটছে তার একটা সম্যক ধারণা রাখতে হবে। আমি এটা ভালোবাসি না, তাই এটা নিয়ে খবর রাখব না, এই বললে চলবে না। কে বলতে পারে, কাল তোমার রেডিও স্টেশনের বস তোমাকে এমন একটা বিষয়ে অনুষ্ঠান করতে বললেন, যেটা তোমার না পসন্দ। তখন কি চাকরি ছেড়ে চলে আসবে?

৪. সবরকম গান শুনতে হবে। আঞ্চলিক গান থেকে শুরু করে ওয়ার্ল্ড চার্ট বাস্টারে কোনটা টপে রয়েছে-অন্তত জেনে রাখতে হবে।

৫. দরকার রপ্ত করার ক্ষমতা ও মন। আমি সব জানি, সব বুঝি এই ধারণা আজকের প্রফেশনাল ওয়ার্ল্ডে অচল। এখানে সবাই রোজ নতুন কিছু শিখছে। তাই যেখানে কাজ করবে, সেখানে চারপাশের মানুষদের থেকে কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা থামাবে না।

৬. নেটওয়ার্কিং বাড়াও। আজকের যুগে কেউ তোমার মুখে সোনার চামচ এগিয়ে দেবে না।  মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে-মেয়ে হলে তোমাকেই তোমার চেনাজানার পরিধি বাড়াতে হবে। মুখচোরা হয়ে থেকো না। নতুন কারুর সঙ্গে দেখা হলে কথা বলো। কাল সেই যে তোমার কোনও কাজে লেগে যাবে না এ কথা কে বলতে পারে?

পড়াশোনার সূত্রে কোনও নামী মানুষের সঙ্গে আলাপ হলে তার সঙ্গে যোগাযোগটা রেখো। প্রফেশনাল কার্টসি মেনটেন করতে হবে। প্রয়োজনে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটকে ব্যবহার করে টাচে থাকো। তোমার বন্ধু রেডিওয় চাকরি পেলে, তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখো।

 আর জে প্রবীণ
আর জে প্রবীণ

৭. কথায় লাগাম পরাও। মুখের সামনে মাইক বা শ্রোতা পেলে যা মুখে এল বলে দিলাম-চলে না। ডিসেন্সি বজায় রাখো। তুমিই নজর কাড়বে আত্মবিশ্বাসটা রাখো। আজকাল অনেক এফ এম স্টেশনেই এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয় যেগুলি বাড়ির সকলের সামনে শোনা যায় না। এটা ওই সংস্থার অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি হতে পারে, রেডিওর ভবিষ্যত নয়।

৮. জানতে হবে শব্দের কাটাছেঁড়া ও জোড়া লাগানোর পদ্ধতি। আগেই বলেছিলেন রেডিওয় কাজ করা মানেই শুধু বকবক করা নয়। এখানে রেকর্ডিং করা, সাউন্ড এডিট করা, স্ক্রিপ্ট লেখার মতো হাজারো জিনিস করতে হয়। দরকার পড়লে বাইরে বেরিয়ে সাউন্ড রেকর্ড করে এনে নিজেকে এডিট করতে হয়। বেসরকারি এফ এম স্টেশনে কিন্তু প্রচুর লোক মোটেও কাজ করে না। তাই বাড়িতে হোক বা কোনও সংস্থায়, সাউন্ড এডিটিং টেকনোলজির প্রাথমিক জ্ঞানটুকু শিখে রাখা ভালো। তবে কোনও সংস্থায় ভর্তি হওয়ার আগে ভালো করে খোঁজখবর নিতে ভুলো না।

৯. প্রফেশনাল সিভি তৈরি করো। বেসরকারি এফ এম স্টেশনে ফোর্সড অ্যাপ্লিকেশন করা যেতেই পারে। কোনও বন্ধুর হাতে বানানো নয়, পারলে প্রফেশনাল সিভি বানায় এমন কোনও সংস্থা থেকে বানিয়ে বাড়িতে হাতের কাছে কয়েকটা প্রিন্ট আউট রেখে দাও। কোথাও ভ্যাকেন্সি আছে জানতে পারলে একটা প্রফেশনাল সিভি ড্রপ করে এসো। মনে রেখো, তোমার সিভিই কোনও সংস্থার কাছে তোমার প্রথম পরিচয়।

১০. নিজের গলার যত্ন নাও। ঠাণ্ডা পানীয়, খুব গরম খাবারদাবার, সিগারেট, মদ ত্যাগ করতেই হবে। যারা রেডিও প্রেজেন্টেশনে নিজেদের মহীরুহ হিসেবে গড়ে তুলেছেন, তাদের লাইফ-স্টাইল কিন্তু একজন সন্ন্যাসীর মতো। কণ্ঠকে প্রভাবিত করতে পারে এমন খাওয়াদাওয়া কমাতে হবে। তাহলেই অনেকদিন পর্যন্ত গলা ভালো থাকবে।

 আর জে রয়
আর জে রয়

কী করে চাকরি পাব?

আকাশবাণী বোধহয় আজও আমাদের রাজ্যের ছেলেমেয়ের সবথেকে বেশি এক্সপোজার দেয়। আকাশবাণীর আলাদা একটি বিভাগই রয়েছে টিন এজারদের জন্য। যুববাণী। আজ যাদের আমরা রেডিও-টিভিতে অনুষ্ঠান করছে দেখতে বা শুনতে পাই-খবর নিয়ে দেখো, তারাও একদিন এই যুববাণী থেকেই কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। এমনকী ডিস্কো কিং বাপ্পি লাহিড়িও। তাই আজও  যারাই আকাশবাণীতে ঢোকেন, গেটের সামনে প্রণাম সেরে নেন একবার।

কী করে যোগাযোগ করবে? সোজা চলে যাও আকাশবাণী ভবনে। জেনে এসো কবে নাগাদ যুববাণীর পরীক্ষার ফর্ম দেয়। মিডিয়াম ওয়েভেও শুনতে পারো। খবরের কাগজে নজর রাখো এফ এম-এ লোক নেওয়ার বিজ্ঞাপন সেখানে বেরোয়।

প্রাইভেট এফ এম স্টেশনে গিয়ে কথা বলো। জানো সেখানে ভ্যাকেন্সি আছে কী না। ফোর্সড অ্যাপ্লিকেশন করার কথা শুরুতেই বলেছি। আর প্রাইভেট চ্যানেলরা তো প্রায় প্রতিবছরই কোন না কোন সময় রেডিও জকি হান্ট করে। সেদিকেও নজর রেখো। একটা সুযোগ পেলেই কেল্লাফতে করতে হবে তোমায়।

শেষে বলি, এফ এম স্টেশনে রেডিও জকি ছাড়াও রেডিও প্রোডিউসরদের একটা বড় ভূমিকা থাকে। সেক্ষেত্রে একজন প্রোডিউসারকে জানতে হয় কোন ধরনের অনুষ্ঠান মানুষ শুনতে চায়, কোনটা থেকে বিজ্ঞাপন আসবে ইত্যাদি। থাক সে সব ভারি শক্ত শক্ত কথা। পরের কোনও ইস্যুতে বলব।