বাংলা ছবির ‘আচ্ছে দিন’ কি চলে গেল !

396
সপ্তপদী-তে উত্তম-সুচিত্রা

kinkiniবাংলা ছবিতে ‘আচ্ছা দিন’-এর বাদ্যি প্রায়শই শোনা যায়৷ তবে সে কি স্রেফ ফাঁকা আওয়াজ৷ ছবি হিটের সংখ্যা আর বক্সঅফিসের লক্ষ্মীভাঁড় কিন্তু উল্টো কথাই বলে৷ খতিয়ে দেখলেন কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়৷

ক’দিন আগেও বাংলা ছবি নাকি ‘কোমা’য় চলে গিয়েছিল৷ সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘চতুষ্কোণ’ প্রায়  অক্সিজেন মাস্কের মতো সে যাত্রা বাঁচিয়েছিল বাংলা ছবিকে৷ এ সাফল্যের খতিয়ানও গত বছরের৷ এ বছরের অর্ধেক পেরিয়ে গিয়ে সাফল্যের স্বাদ দেখা সিনেমা বলতে হাতে গোণা মোটে তিনটে সিনেমা- এবার শবর, ওপেন টি বায়োস্কোপ ও বেলাশেষে৷ তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবির বক্সঅফিস সাফল্য আরও খারাপ৷ বড় নায়করাও আর দর্শক টানতে পারছেন না৷ এমনকী বাংলা ছবির মিঃ ‘ইন্ডাস্ট্রি’ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও সওয়াল করেছেন বাণিজ্যিক ছবির আরও বেশী বেশী হওয়ার পক্ষেষ নচেৎ যে ইন্ডাস্ট্রির কপালে দুঃখ আছে সে কথা দ্বিধাহীন জানিয়ে দিয়েছেন তিনি৷ বাংলা ছবির মন্দভাগ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে একাধিক কারণ-স্যাটেলাইট রাইটের অর্থমূল্য কমে যাওয়া থেকে কলাকুশলীদের মাত্রারিক্ত পারিশ্রমিক, বেশী সংখ্যায় ছবিমুক্তি-উঠে এসেছে সবই৷ বড়পর্দা ছেড়ে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে পরিচালকরা আবার দ্বারস্থ হয়েছেন ছোটপর্দার কাছে৷ তবে কারণ খুঁজতে যেতে হবে আরও পিছনে৷

shaptapadi
সপ্তপদী

ষাটের দশকের বাংলা ছবির স্বর্ণযুগ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের জগতের সেই উচ্ছ্বল জোয়ার একেবারেই মিলিয়ে গেল। সেইসময়ে এখনকার মতো বিপুল সংখ্যায় মুম্বই থেকে অভিনেতা-গায়ক-শিল্পীরা টালিগঞ্জে এসে পাড়া মাতাতেন না, তার বদলে টালিগঞ্জ থেকে শিল্পীরা মুম্বই কাঁপিয়ে রাজত্ব করতেন। বয়স-লিঙ্গ-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ সপরিবারে উপভোগ করতেন উত্তম-সুচিত্রা ম্যাজিক। সেই সোনার যুগ শেষ হতে বাংলা ছবির জগতে এল অদ্ভুত এক আঁধার। ঘরে ঘরে টেলিভিশন এসে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক সিনেমাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বোকাবাক্সর ফ্রেমে নিজেকে বন্দি করে ফেলল। ফলে বাণিজ্যিক স্বার্থের কথা ভেবেই বাংলা সিনেমার টার্গেট অডিয়েন্স হয়ে উঠল তুলনায় নিম্নবিত্ত, গ্রামাঞ্চলের বাঙালি সমাজ। তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সিনেমায় গল্প-চিত্রনাট্য-অভিনয়ের বদলে জায়গা পেতে লাগল অতিনাটকীয়তা এবং চটুলতা। বাণিজ্যিক অসাফল্যের কারণে ধীরে ধীরে বন্ধ হতে লাগল শহরের এককালের নামজাদা সিনেমা হল। শিক্ষিত বাঙালি দর্শক হিন্দি ছবি দেখলেও চলতি বাংলা ছবি থেকে মুখ ফেরালেন।

'আগুন্তুক'
‘আগন্তুক’

বছর দশেক আগেও এরকমই অবস্থা ছিল বাংলা ছবির, যদিও এখন এই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত প্যাকেজিং আর বাস্তবসম্মত কাহিনি-চিত্রনাট্যের কারণে মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক আবার হলমুখী হয়েছে। শহুরে দর্শকের কারণে এমনকী মাল্টিপ্লেক্সেও হাউসফুল হচ্ছে বাংলা সিনেমা। যদিও এখনকার বাংলা ছবিতে ‘বাণিজ্যিক’ এবং ‘অন্যধারার’ এইদুটি ভাগ স্পষ্ট। এই বিভাজন যে সেযুগে ছিল না তা নয়- ঋত্বিক-সত্যজিতের ছবির সঙ্গে মূল উত্তম-সুচিত্রা ঘরানার ছবির পার্থক্য চিরদিনই ছিল। ঠিক সেইরকমই স্বপন সাহা-প্রভাত রায়-রবি কিনাগীর পাশাপাশি তপন সিংহ-অপর্ণা সেন-ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির আলাদা দর্শকও স্বাভাবিক নিয়মেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মুশকিল হল ওই ‘মূলধারা’র বাংলা ছবি নিয়েই, কারণ ওই ছবিরই দর্শক বেশী। দেখা গেল, আশি-নব্বই দশকের বাংলা ছবিতে মৌলিক কাহিনির অভাব। কারণ এর আগে ষাট-সত্তরের বাংলা ছবি ছিল সাহিত্যনির্ভর। সাহিত্যরসিক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙ্গালির জন্য শরৎচন্দ্র-তারাশঙ্কর-শক্তিপদ রাজগুরু-সুবোধ ঘোষের কাহিনি নিয়ে তৈরি হত সেইসময়ের ছবি। কিন্তু  তারপরে টার্গেট অডিয়েন্সের বদলের সঙ্গে সঙ্গে কাহিনির বদলে জোর দেওয়া হতে লাগল হিন্দী ছবি ঘেঁষা অ্যাকশন-নাচগান-মেলোড্রামাটিক চড়া সুরের সংলাপের উপর। সাধারণ বাঙালিও ততদিনে টিভিনির্ভর বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে সাহিত্যের পাঠ সরিয়ে রেখেছে দূরে। মূল বাণিজ্যিক ধারার ছবিতে বরং দরকার চমক- যে চমক খুব বাস্তবসম্মত নাহলেও চলবে। এই কারণে ৯০’র পর থেকে ২০০০ বা তারওপরের বাংলা ছবির মূল উপজীব্য হতে লাগল দক্ষিণী ছবির রিমেক। বাংলা মূলধারার ছবিতে কাহিনীর মৌলিকত্ব একেবারেই অনুপস্থিত হয়ে গেল।

বেলাশেষে
বেলাশেষে

কিন্তু ততদিনে বাঙালি দর্শক এতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক ছবিতে প্রায় বছর কুড়ির প্রসেনজিতরাজের পর নতুন নতুন নায়ক নায়িকার আকর্ষণে মধ্যবিত্ত বাঙালি আবার হলমুখীও হয়েছে। এখন এমনকী শহরের মাল্টিপ্লেক্সেও বাণিজ্যিক বাংলা ছবি দেখতে ভিড় উপচে পড়ছে, যদিও সেইসব ছবি সম্পূর্ণভাবেই দক্ষিণী ছবির নকল, একেবারে সীন বাই সীন অনুকরণ।

অন্যধারার বাংলা ছবির ব্যাপার আবার আলাদা। ঋতুপর্ণ ঘোষ-অপর্ণা সেনের মেধাবী নির্মাণকে সত্যজিত যুগের উত্তরসূরী বলা যেতে পারে। কিন্তু সৃজিত-মৈনাকের তথাকথিত ‘শহুরে’ সিনেমাকে মোটেই এই ছাতার তলায় আনা যায় না। এও যেন বিশেষ একটি শ্রেণীর মানুষের জন্য বানানো একরকমের ‘বাণিজ্যিক’ সিনেমাই, চলচ্চিত্রের মানচিত্রের গ্রাম-শহরের ব্যবধান স্পষ্ট করার জন্যই যেন এই আয়োজন। এইসব সিনেমা অনেক সময়ই তাৎক্ষণিকভাবে হিট হচ্ছে, জনপ্রিয় হচ্ছে ছবির গানও, কিন্তু সার্বজনীন স্তরে যেমন জনপ্রিয় হচ্ছে না ঠিক তেমনই চিরন্তনও হচ্ছেনা এইসব ছবির আবেদন। আবার, ‘আমি আদু’, ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’, ‘ফড়িং’-এর মতো মৌলিক কাহিনীনির্ভর বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণের বাংলা ছবি সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও সঠিক পরিবেশনা এবং ব্যবসার অভাবে দর্শকের মুখ দেখতে পাচ্ছে না। মোট কথা স্বর্ণযুগের মতো একইসঙ্গে সমস্ত শ্রেণীর দর্শকের মন মাতানো এবং বক্সঅফিসে লক্ষ্মীলাভ করানোর সিনেমা আজকাল আর তৈরি হচ্ছে না।

 বাংলা সিনেমার এই অবক্ষয় কবে দূর হবে, সেটাই এখন দেখার।

ফড়িং
ফড়িং