মাদকের মোহে মেদুর রাতের তিলোত্তমা

676

মেট্রপোলিটন শহরের তকমা তার শরীরে৷ রূপে-গুণে, কাজের বহরে সে অন্যান্য শহরকে কতটা টেক্কা দিতে পারবে কে জানে, কিন্তু রাতজাগায় তার জুড়ি মেলা ভার৷ তার দিকে তাকিয়ে অনেকের অভিযোগ সন্ধে নামলেই নাকি তাকে পেয়ে বসে ঘুমের ঘোর৷ যত রাত গড়ায় সে নাকি ক্রমশ আড়ষ্ট হয়ে ওঠে, আর তারপর নিশুতি রাতের নীরবতা তাকে পেয়ে বসে৷ এভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে কলকাতা? শহর মুচকি হেসে জানায়, না৷ সে ঘুমন্ত ঠিকই, তবে যারা ঘুমিয়ে পড়ে শুধু তাদের কাছে৷ আর বাকিদের কাছে সে রাতজাগা পরী৷ তখন তার শরীরে খেলে যায় মায়াবী নিয়ন৷ পাল্টে যায় তার দিনমানের রূপ৷ রাতের মাসকারা দু’চোখে মেখে সে মোহময়ী হাতছানি দেয় শহরের  রাতজাগাদের৷ না ঘুমোয় না কলকাতা, জেগে থাকে তাদের কাছে, যারা জেগে থাকে জাগার নেশায়৷night-club-2

আসলে সারাদিনের তো শহর নুয়ে থাকে হার্ডওয়ার্কের চাপে৷ কর্পোরেট প্রেশার  চেপে বসে তার নার্ভে৷ তারপর সন্ধে নামার আগে সে মনে মনে আওড়ে নেয় পার্টি হার্ডারের মন্ত্র৷ অনলাইনে স্মার্ট শহর নিমেষে কানেক্টেড হয়ে পড়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূব থেকে পশ্চিমে৷ তারপর রাতের পেগে ছলকে ওঠে পেগে দু’পাত্র উদ্দীপনা৷ শহুরে স্নিগ্ধতার এক অন্য অর্থ খুঁজে নিয়ে রাত-পরীর নিয়ন আলোতেই জেগে ওঠে উদ্দীপনা৷ আর তরুণ শহর, আমরা যাকে বলি Gen X-এর শহর, সে বেছে নেয় রাত জাগার এক অদ্ভুত উল্লাস৷ এই সেদিনও রোডসাইড ধাবা অথবা দক্ষিণ কলকাতার কোনও গুরুদ্বোয়ারার পার্কিং-এ গাড়ি থামিয়ে তড়কা রুটিই ছিল শহরের পরিচিত নিশিযাপন৷ কিন্তু ফিলহালের কল্লোলিনী বেছে নেয় কোনও এক রঙিন ডান্স ফ্লোর অথবা মাদকীয় মুগ্ধতায় জড়ানো আলতো হাতের ছোঁয়া৷ আবার কখনও ডিজের মিউজিক বিটের মধ্যে আদিম সভ্যতার হৃদস্পন্দন৷

Spandan Banerjee
Spandan Banerjee

আর তাই নাইটলাইফকে ফোকাস করে ক্যাম্পাসের চতুর্থ সংখ্যায় আইস-Spice বিভাগে মহানগরের চারটি নৈশালোক জোন ঘুরে দেখলেন স্পন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়৷

nytclub4কলকাতার মনে জায়গা করে নেয় হালে হওয়া ‘দ্য মিক্স’, ইংরেজিতে The Myx৷ পার্ক স্ট্রিটের এই নয়া নিশিযাপনের হ্যাংআউট অনেক রকমেরই বিনোদন নিয়ে হাজির শহরের বুকে৷ রাত ৮টা থেকে ১২ পর্যন্ত মিক্সে চলে ‘মিক্সিং অফ কাউন্টার কালচার’৷ আলিশান আলোকরোশনাইয়ে মোড়া স্যান্ডস্টোন দিয়ে তৈরি বিল্ডিংয়ের প্রথম তিনটি লেভেলে আইরা-চিলি ওক্-আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ডে রয়েছে খানা-পিনার ব্যবস্থা৷ আর তার ঠিক ওপরেই স্পেশিয়াস ডান্স ফ্লোর৷ সঙ্গে রঙিন জলের মাদকীয়তা ও লাইভ মিউজিকের কোমর দোলানি৷ দ্য মিক্সেসের আবহাওয়াতে মত্ত মহানগর বলতেই পারে, ‘Yes, that’s the place’৷ দ্য মিক্সের এক্স ফ্যাক্টর নিজস্ব ফিংগার ফুড, যা একদমই মিস করার মতো নয়৷

আবার কখনও ইয়ং কলকাতা ঠাঁই নেয় ক্যামাক স্ট্রিটের বন্ধ হয়ে যাওয়া এক ডিসকোথেকের বিল্ডিংয়ে অন্য আর এক ‘আর্বান ঠেক’-এ৷ আর্বান দেশি ৯এফ, ইংরেজিতে ‘Urban Dezi 9F’৷ নাম শুনেই বারোটা থেকে বারোটার এই কোজি অ্যম্বিয়েন্সে ঘড়ির কাঁটা থেমে যায় অনেক শহুরে পড়ুয়ারই৷ ন’তলার ওপরে এই বার-রেস্তরাঁ-হুকা বার কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের ফেভারিট ডেস্টিনেশন৷ হাল ফ্যাশনের মেয়েদেরতো এই জায়গার ‘হ্যাপি হাওয়ার’ ঠোঁটের ডগায়৷ তারা তো বলেই ফেলে, আর্বান দেসির হ্যাপি হাওয়ারে দুটো ড্রিঙ্ক নিলে তৃতীয়টা ফ্রি এবং হুকাতেও এক গল্প৷ এখানকার টুটি-ফ্রুটি হুকা টিনদের মধ্যে কাড়াকাড়ির বিষয়৷

এখানে এলে, দু’পেগ হুইস্কির পর ন’তলার উপর থেকে দূরে মিশে যাওয়া আঁকা-বাঁকা সড়কটা দেখে মনে হতেই পারে, “শহর যেন কবিতা, হারিয়ে সংহতি..”৷

চাইনিজ ও মোগলাই খাবারের পাশাপাশি লেজার শো এবং রাতমাতানো মিউজিকও এখানকার ইউএসপি৷nytclub1

উচ্চ মধ্যবিত্তদের নিশিযাপনের আস্তানার আবার হরেক রকম ঠিকানা৷ অ্যাস্টরের প্লাশ, ‘Plush’৷ হ্যাঁ, থিয়েটার রোডের এই পাঁচতারা হোটেলের নাইটক্লাবের নামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শহরের অ্যাড্রেনালিন স্প্ল্যাস৷ ড্রিংক থেকে হুকা-মনোরম পরিবেশ, সঙ্গে ‘স্পাইসি গ্লেজড প্রণ’ অথবা ‘ক্যারিবিয়ান চিকেন স্কিউয়ার’ তো মাস্ট৷ শহরের ‘উইথ দ্য ট্রেন্ড’ বাবলিদের কাছে বুধবারের প্লাশ অন্য মানে বহন করে৷ কারণ, এই দিন প্লাশে চলে উইমেন’স হ্যাপি হাওয়ার৷ তন্দুরি আলো ও দামি পারফিউমের খাঁজে বইতে থাকে আনলিমি়টেড ককটেলের স্রোত৷ সাধারণ যে কোনও দিন ৫টা থেকে ১২টা ও ৩টে থেকে রাত ১টা পর্যন্ত, শনিবার খোলা থাকে এই উদ্দীপনা উদযাপনের সক্রিয় গেট পাস৷ তবে ভুল করেও সোমবার যাবে না, ওই একদিনই বন্ধ থাকে প্লাশ৷ আর মঙ্গল থেকে শুক্র ৫টা থেকে ৮টা হ্যাপি হাওয়ার চলে এখানে৷ শনি-রবি হ্যাপি হাওয়ার থাকে ৩টে থেকে ৮টা৷

ব্যস্ত শেক্সপিয়র সরণিতে জ্যাসমিন টাওয়ারে অবস্থিত ‘নকচার্ন’ অথবা আমেরিকানার দোহাই দিয়ে ‘নকটার্ন’, ইংরেজিতে Nocturne শহরের আর একটি হাইডআউট৷ RJ অনির্বানের চোখে এখানে কলকাতার ক্লাসি ক্রাউডরাই আসেন৷ ঝলমলে আলো ও ঝকঝকে ইন্টেরিয়রস৷ এক চিলতে অ্যরিস্ট্রোকেসিতেই ফিদা এখানকার ক্লাব সভ্যতার ব্যাটন বয়ে নিয়ে যাওয়া জনতা৷ এখানকার ফিংগার ফুড ও পিৎজা তিলোত্তমার হট ফেভারিট৷ রাত বাড়তে না বাড়তেই মৃদু মিউজিক থেকে লাউড সাউন্ডে জমে ওঠে এখানকার নকটার্নাল লাইফস্টাইল৷ দুপুর ২টো থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে নকচার্ন৷ আলাদা এক স্মোকিং জোনও রয়েছে এখানে৷

সব মিলিয়ে রাত পরীর মায়াবী নেশায় ঘুম কে ফাঁকি দিতে কোনও ভাবেই পিছপা হয়না তিলোত্তমা৷ বলাই যেতে পারে, এই আলো-আঁধারের খেলায়, অন্ধকারেই নিজের কমফোর্ট জোন খুঁজে নেয় সিটি অফ জয়৷