আমার স্বপ্নে দেখা কলকাতা

621

tanmoyকেমন হত যদি হট করে বদলে যেত কলকাতার খোলনলচে? নতুন মোড়কে সেজে উঠত তিলোত্তমা? মহানগরের সাদা-কালো ক্যানভাসে ভেসে উঠত রঙিন তুলি? চেনা শহরকে আর একবার নতুন করে চেনালেন তন্ময় চক্রবর্তী৷

ভোর প্রায় ৫.৩০টা৷ নির্ধারিত সময়ে তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস থেকে শিয়ালদহ স্টেশনে নামতেই নিজেকে অন্য গ্রহের বাসিন্দা বলেই মনে হল৷ কারণ-এ তো আমার চেনা নয়৷ যত ৯A প্ল্যাটফর্ম থেকে দক্ষিণ শাখার ট্রেন ধরতে এগোতে থাকলাম ততই অবাক হলাম৷ আর লোকাল ট্রেনে ওঠার পর তো বলতে ইচ্ছে করছিল ‘অবাক কলকাতা অবাক করলে তুমি’৷ ভিড় রয়েছে আগের মতোই৷ কিন্তু, সেই ঠেলাঠেলি, অশ্রাব্য গালাগালি, খিস্তি কোথায়? ট্রেনে ভেন্ডররাও উঠছে তাদের সংরক্ষিত কামরাতেই৷ তাই, হাত-পা ছড়িয়ে দরজার ধারে দাঁড়িয়ে মুক্ত বাতাস গায়ে লাগিয়েই পৌঁছে গেলাম যাদবপুর স্টেশনে৷

grafiti কিন্তু, পার্ক সার্কাস স্টেশনটির তো দেখা পেলাম না৷ চোখ বুজে এলেও অন্য সময় হলে ঠিক এর অস্বিত্ব টের পেতাম৷ কিন্তু, এবার যে সেই অস্বস্তিকর গন্ধটাই তো নাকে লাগেনি৷ যাই হোক! এরপর থেকে একের পর এক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটতে থাকল৷ সামনেই ভোট৷ কিন্তু, দেওয়ালে দেওয়ালে লড়াই কোথায়? তার জায়গায় রাস্তার ধারের বাড়িগুলির দেওয়ালে চোখে পড়ল একের পর এক শিল্পকর্ম৷ মেসের সামনের ঝিলটিকে দেখে মনে হল ঝিল কমিটির আর দরকার নেই৷ আগে যে কয়েকটি বোজানো পুকুর বা ডোবা ছিল সেখানেও কোন এক জাদুকাঠির ছোঁয়ায় আবার বইছে পরিষ্কার জলের স্রোত৷

বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যাচ্ছে না৷ ইট-কাঠ-পাথরের মাঝেই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সবুজ৷ যত দিন যাচ্ছে তত পরিবর্তন চোখে পড়ছে৷ ২০১১ সালের পরও যা বিশেষ একটা চোখে পড়েনি৷ বাসে উঠলে ভুল করে কারও পায়ের উপর পা উঠে গেলেও কেউ আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করছে না৷ উল্টে নম্রভাবে সরে দাঁড়াচ্ছেন৷ আর সুন্দরী কোনও তম্বী দাঁড়িয়ে থাকলে আড় চোখে দেখার বদলে নির্দ্বিধায় আসন ছেড়ে দিচ্ছেন৷ বয়স্কদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে তরুণীরাও দাঁড়িয়ে পড়ছেন৷

শিয়ালদহ হোক বা হাওড়া স্টেশন বা বিবাদীবাগ বাসস্ট্যান্ড৷ ‘সারাদিন খাইনি, একটু খাব’ বলে কেউ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না যে৷ যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা কোথায়৷ রাস্তার ধারে ধারে ডাস্টবিন৷ কেউ সেখানে নোংরা না ফেললেই জরিমানা ধার্য করার কথা বলা হয়েছে৷ যদিও, সরকারি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধিতা করতে দেখা যায়নি কাউকে৷ তবে, মিছিল নগরীর তকমাটা মুছে ফেলা যায়নি৷ মুখে স্লোগান নেই, হাতে রয়েছে শুধু প্ল্যাকার্ড৷ বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা বা শাসকের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার প্রচেষ্টার জন্য মিছিল নয়৷ মোলিক অধিকার খর্ব বা অন্যায় হলেই রাজপথে পায়ে পা মেলাচ্ছেন নাগরিকরা৷ তাও আবার হাতে মোমবাতি নিয়ে মৌন মিছিল৷ চিল চিৎকারে মহানগরের আকাশ বাতাস মুখরিত হচ্ছে না৷ যারা পথ হাঁটছেন তাদের গায়ে কোনও রঙ নেই৷

দোকানে তালা ঝুলছে, রাস্তা-ঘাট শুনশান৷ বহুদিন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় এই ছবি চোখে পড়েনি৷ কর্মসংস্কৃতি ফেরাতে বহু দাদা-দিদিই অনেক সময় অনেক কথা বলেছে কিন্তু এটাই আসল পরিবর্তন৷ আর রাতের মোহময়ী মহানগরের রাজপথে কিংবা অলিতে গলিতে কিশোরী থেকে যুবতীকে একা একাই বাড়ি ফিরতে দেখা যাচ্ছে৷ কেই টিউশন থেকে কেউ অফিস থেকে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি তাণ্ডবের প্রতিবাদে মৌন মিছিল করতে হচ্ছে না৷ শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে যে সম্পর্কের কথা শুধু বইয়ের পাতায় পড়েছি তাঁর উৎকৃষ্ট উrallyদাহরণ এখন হয়ে উঠেছে তিলোত্তমার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি৷

সন্ধে হলেই মেক আপ করে টক শোতে বসার বদলে উন্নয়ন যজ্ঞেই তাঁদের মহামূল্যবান সময় ব্যয় করছেন রাজনীতিকরা৷ কিছু ক্ষেত্রে কলকাতা আছে কলকাতাতেই৷ কিন্তু, রাস্তা-ঘাটে হয়রানি নেই৷ লোক দেখানো খয়রাতি নেই৷ সমকামিতার মতো বিষয়গুলি আর আলোচনার বিষয় নয়৷ না টক শোতে না পাড়ার রকে৷ এ কী হল! ২০১১ সালের করা প্রতিশ্রতি কী পূরণ করলেন দিদি৷ না! কলকাতা আই আছে বটে৷ কিন্তু, বিগ বেন, টাওয়ার অফ লন্ডন, টাওয়ার ব্রিজের আদলে তো কিছু চোখে পড়ছে না৷ মানে, চোখ বুঝে অনুকরণ করেনি বাঙালি৷ শহরের রানি তাই সেজেছে নতুন রূপে৷ এই সুখবরটা কলকাতার এক প্রেমিক অর্থাৎ প্রবাসে থাকা আমার এক বন্ধুকে জানাব বলে মোবাইলটা খুঁজতে যাব, সেই সময় কলতলার ঝগড়াতে ঘুমটা ভেঙে গেল৷ বাড়ির সামনেই যে জলের কল৷ ও! তার মানে…হ্যাঁ! স্বপ্ন ছিল৷ কিন্তু স্বপ্ন হলেও তা সুন্দর ছিল৷