ঘুড়ি কেটে যায় কিন্তু লাটাই থেকে যায়

720

কফি jeetপার্লারে এসিতে বসে ক্যাপুচিনো নাকি পাড়ায় বসে মাটির ভাঁড়ে লিকার চা৷বিপ্রতীপে জোগের  চুমুক৷ ব্র্যান্ড বন্দনার অস্থিরতায় প্লাস্টিক স্মাইলে মোড়া জীবনযাপনের দুই চরিত্রকে আলোয় আনলেন শুভপম সাহা৷

সেক্টর ফাইভের কোনও একটা বিপিওতে কাজ করে বাপ্পাদিত্য৷এটাই ওর ব্যাপারে পাওয়া আমার শেষ আপডেট ছিল৷আমরা বাপি বলেই ডাকতাম৷ ছোট থেকেই ওকে চিনি৷ কোনওদিন বাড়ি থেকে বেরোনর সময় নিজেকে প্রশ্ন পর্যন্ত করেনি যে পকেটে পার্সটা আছে তো? আসলে বন্ধুরা আছে পুরোটা সামলে নেবে৷ বাপি মানেই তো আর ‘লাহিড়ী’ সুলভ ‘সোনা’য় মোড়া ছেলে হবে তার কোনও মানে নেই৷ আপনার চেনা গড়পড়তা আর পাঁচটা বাপিদের মতোই৷

rickshawবাপি এখন কেটেকুটে হাতে বারো হাজার টাকা পায়৷ বাবা অবসর নিয়েছেন৷ স্বেচ্ছায় নয়৷ বয়সের ভারে৷ বাপির মা মানে আমাদের কাকিমা এখনও আগের মতোই বাড়ি-বাড়ি গিয়ে টিউশন পড়ায়৷ বোন সবে ফার্স্ট ইয়ার, মনিন্দ্র কলেজ৷ অনেক দিন হল আমাদের পাড়া ছেড়ে কেষ্টপুরে মাথা গুজেছে৷ এটাই ওদের ফ্যামিলির স্টেটাস৷ এতকিছু জানলাম বাপির থেকেই৷ ও বলা হয়নি বাপির সঙ্গে সেদিনকেই দেখা হল সল্টলেক সুইমুংপুলের কাছাকাছি সিসিডি-র সামনে৷ এর আগে ফেসবুকে টুকটাক কথা হয়েছে ৷ও ব্যস্ত মানুষ৷আর আমার সঙ্গী মানুষের ব্যস্ততা৷ দেখা হতেই বাপিকে বললাম কীরে কী খবর? ‘ও বলল এই চলছে ভাই৷’ আমার পাল্টা প্রশ্ন এখানে কি কোনও কাজে? বলল ‘ নারে সিসিডি-তে এসেছিসলাম বিদিশার সঙ্গে৷ বিদিশা ওর গার্লফ্রেন্ড৷ আমি বললাম তাহলে নিশ্চই তোর চা চলবে না? ও বলল ‘ এই জাস্ট একটা গ্রিন অ্যাপেল মেল্টডাউন ও স্মোকড চিকেন স্যান্ডউইচ খেলাম রে৷’ আমি বললাম ও আচ্ছা৷ আমি আবার বললাম শেষ কবে ভাঁড়ে চা খেয়েছিস৷ হেসে বলল ‘ মনে নেই রে ভাই৷ আমার সৌভাগ্য যে বিদিশা সিসিডি’র উল্টোদিকে ওর মাসির বাড়িতে কী একটা কাজে গিয়েছিল৷ তাই বাপি সিসিডি-র সামনে দাঁড়িয়ে ছিল৷ হঠাৎ বিদিশাও চলে এল৷ বাপি আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে বলল ‘আমার উড বি৷’ আমিও প্লাস্টিক স্মাইল দিয়ে ‘নাইস টু মিট ইউ’ বললাম৷ তারপর কিছুক্ষণ কথা বলতে-বলতে আমাদের সামনে সাদা একটা সুইফট ডিজায়ার চলে এল৷ ওরা দু’জন উঠে পড়ল৷ যদিও আমাকে লিফট অফার করেছিল৷কিন্তু আমার কাজ ছিল বলে গেলাম না৷

বাপি-বিদিশাকে আপাতত ফেডআউট করলাম লেখা থেকে৷ কাট টু আমার কপি৷ বাপিরা চলে যেতেই ভাবলাম আচ্ছা বাপি কী বদলে গেল? নাকি ও বদলাতে বাধ্য হয়েছে? আসলে এরকম অনেক বাপি-বিদিশাদের আপনিও দেখেছেন৷ বাগবাজার টু বালিগঞ্জে এদের এখন অবাধ বিচরণ৷ ‘বন্দে মাতরম’-এর দেশ এখন ‘ব্র্যান্ডে মাতরম’-এর সুরে দুলছে৷ হাতের ঘড়ি থেকে পায়ের জুতো ব্র্যান্ডের তেলে চুবে চুপচুপ করছে৷ ব্র্যান্ড ভূত ভর করেছে বাপিদের৷এরা সিসিডি বা বারিস্তা ছাড়া কথা বলার জন্য কোথাও ‘তাসরিফ’ও রাখে না৷ আজকাল ট্যাক্সিতেও খুব একটা ওঠে না ওরা৷ ‘ওলা’য় উঠে বা ‘উবের’-এ চেপে নিজেদের খানিকটা ধনকুবের ভাবে৷ ইন দ্য ভোগ অফ মায়ের সন্তানরা ইন দ্য নেম অফ ব্র্যান্ড বলে টপাটপ শহিদ হচ্ছে৷বান্ধবীকে নিয়ে মিত্রা বা প্রাচীর মতো সিনেমা হলে যাওয়ার কথা ভাবলেও এরা ব্রেন স্ক্যান করাতে পারে৷ এহেন বাপিদেরই বগলদাবা করে বিদিশিরা কোয়েস্ট মলে গিয়ে কষ্টের টাকার ট্রু কস্ট উসুল করে নিচ্ছে৷ শুধু একবার ‘জানু’ বলেই শপিংয়ের পর চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া সারছেও কমপক্ষে হাজারখানেক টাকায়৷ ‘সস্তা কেবিনে বন্দি দু’জনে’ এখন নিছকই ঐতিহাসিক গান৷ রেস্তরাঁয় গিয়ে কার্ডে পেমেন্ট না-করলে আর কী খেলাম গোচের মানসিকতা গেঁথে গেছে এদের মধ্যে৷ সেলফিতে ব্রেকগ্রাউন্ড ভালো না-থাকলে ফেসবুকে আপলোডই বা করবে কী করে? তাই না ?boy-with-kite

নব্বইয়ের দশকে বড় হয়ে উঠেছি আমরা৷ সেসময়ও ব্র্যান্ড ছিল৷ আলবাত ছিল৷ বাটার জুতো৷ অনাদির মোগলাই৷ নিউ এম্পায়ারে ইংরেজি ছবি৷ ডাইনোসরের দস্যিপানা৷ কিন্তু কখনই সেটা ‘মাস্ট’ ছিল না৷ ভালোলাগার অঙ্গ ছিল৷ এখন ব্র্যান্ড না-থাকলে স্ট্যাটাস থাকবে না৷ ট্যাগ না-ঝুললে পাত্তা দেবে না কেউ৷ বারোটাকার কদম ছাঁট বা খুব বেশি হলে পনেরোর ‘মাশরুম কাট’ই ছিল আমাদের স্টাইল স্টেটমেন্ট৷ এখন সাঁলো-পার্লারের যুগ৷ পাড়ার সেলুন যে নিছকই আড্ডার ঠেক৷ তারাপাদ, ভানু দা’রা তো বাবা-জেঠুর চুল কেটেছে৷ ওরা ‘ব্রাশড মোহক’ থোরি না-বুঝবে? ব্র্যান্ডের দাদাগিরিতে নিজেদের গলা ফাটানোর জন্যই ব্র্যান্ডকেই বাবা বানিয়ে নেওয়া৷ দোষটা বাপির নয়৷ বাপি যদি এরকম লাইফস্টাইল মেনটেইন না-করে তাহলে বিদিশা যে বাপির হাত ছেড়ে দেবে৷বিদিশা ব্র্যান্ড দেখেই বাপির কাছে এসেছে৷বাপি চলে যাবে৷ ব্র্যান্ড থেকে যাবে৷ আমার কথায় বাপিরা বদলে যাবে না৷ হোয়াটসঅ্যাপে কথা না-বললে আধুনিক হওয়া যাবে না৷ অথচ কথা দিয়ে কথা না-রাখলে কেউ একটা কথাও বলবে না৷ বুক পকেটে থেকে অ্যাপেলের লোগোটা

বেরিয়ে থাকলে তবেই না ‘কাকা কী করেছ’ ! ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিতে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে দিয়ে তপন সিংহ বলিয়েছিলেন,‘ মানুষকে ধরে-ধরে শক দিতে হবে৷ শক থেরাপির মতো’৷ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে শক দেওয়া হচ্ছে৷ আমরা তাড়িয়ে-তাড়িয়ে উপভোগ করছি৷ কখনও ভেবে দেখছি না যে এই ব্র্যান্ড দৈত্য আমাদের নীল তিমির মতো গপাগপ গিলে খাচ্ছে৷ সূক্ষ ভালোলাগা ও ভালোবাসাক ওই দৈত্যটা পিষে মারছে৷ আর আরও বলছি ‘ অওর দিখাও, অওর দিখাও’৷ আর কত দেখব?  মাদারির হয়ে ব্র্যান্ড খেলছে৷ এ খেলায় টিকতে না-পারলে বস তোমায় সাইডলাইনেই থাকতে হবে ব্র্যান্ড মানেই জীবন৷ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে জীবনে ব্র্যান্ডের প্রয়োজন আছে সেটাই ভুলতে বসেছি৷ অন্নপ্রাশণ থেকে শ্রাদ্ধ সেখানে ক্যাটারিংয়ের সময় আপানার কানে কেউ বলে দিচ্ছে রতনকে দিয়ে কেউ ক্যাটারিং করায় নাকি৷ আরে ওদেরকে দিয়ে করান, আরে যারা কোয়েল মল্লিকের বিয়েতে ক্যাটারিং করেছিল৷ বাপিরা বাপির মতোই থাকুক৷

আমার শুধু মনে পড়ে যে বেটা ২৪০ ধরে স্কুল-কলেজে যেত রোজ৷ বিলাসিতা বলতে মিত্র ক্যাফে বা নিজাম৷ কপিলের শরবৎ ভুলে গিয়ে এখন গ্রিন অ্যাপেল মেল্টডাউন৷ উচ্চারণ করতে গিয়ে আমরাই মোরালি ডাউন হয়ে যাব৷ বাপিদের বদলাতে হবে না৷ ব্র্যান্ড যেন থাকে দুধে-ভাতে বলে নিজেদের তোল্লাই দিয়ে ব্র্যান্ডের আকাশে ঘুড়ি হয়ে উড়ুক৷ আর যারা সারা জীবন লাটাই ধরে কাটিয়ে দিল তারাঁ কী করবে? না তাঁরাই তো প্রকৃত ইতিহাসের শরিক৷ ব্র্যান্ডের বিশাল আকাশে লাল-নীল ঘুড়ি উড়ছে উড়ুক৷ ঘুড়ি কেটে যায় কিন্তু লাটাই থেকে যায়৷

ওপেন টি বায়োস্কোপে শেষের দিকে ঋত্বিক ওরফে ফোয়ারা বিদেশ থেকে নিজের শহরে ফিরে এসেছিল৷ ওর জন্য একটা ক্যাসেট পড়ে ছিল আন্ডার কনস্ট্রাকশন বাড়ির জমিতে৷ ভয় লাগে যে ব্র্যান্ডবাজদের জন্য রিলটুকুও পরে থাকবে কি না?