পোশাক-কাহনের মানবিক অধ্যায়

653

suvankarদশের মাঝে নিজেকে একটু অন্য ভাবে present করা দোষের নয়। এটা ব্যক্তি মানুষের স্বাভাবিক আচরণ, বরং রুচিসম্মত পোশাক মানুষের ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট করে প্রকাশ করে। কথায় আছে মানুষের মনের মতন গভীর এ দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় কিছু নেই। অতল সেই গভীরতার তল খোঁজা কঠিন, বৃথা।  আর সেই কঠিনতম কাজেকে সহজ ভাষায় তুলে ধরলেন শুভঙ্কর বড়ুয়া

‘পোশাক’ আপাত নিরীহ একটা শব্দ । সোজা কথায় ‘পোশাক’ বললে বোঝায় পরিধান বা বস্ত্র অথবা চলতি কথায় জামাকাপড়, কিংবা নতুন জেনারেশনের কথায় dress বা wardrobe ।পোশাক কি,কেন,কয় প্রকার, কবে এর উৎপত্তি এইসব জটিল বিষয় নিয়ে তাত্ত্বিক কচকচানিতে না গিয়ে সহজ কথায় বলা যায় আদিম যুগে মূলত লজ্জা নিবারণের তাগিদেই পোশাকের উৎপত্তি । মূলত গাছের ছাল এবং পশুর চামড়াই এক্ষেত্রে ব্যবহার করতেন আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা। লক্ষ লক্ষ বছর আগের আদিম বন্য মানুষ গুলির লজ্জা নিবারণের সেই উপায়ইক্রমে বিবর্তন, আধুনিকতা, বিশ্বায়নের হাত ধরে আজ নয়া মাত্রা পেয়েছে। ‘পোশাক’ এখন আর কেবল মানব শরীরের বাহ্যিক লজ্জা ঢাকার উপায় নয়, ক্রমে তা পরিণত হয়েছে আভ্যন্তরীণ মনন বা মানসিকতা আড়ালের নিপুণ হাতিয়ারে। fashionramp

দুনিয়া জোড়া নেট জালে, ফেসবুক,হোয়াটসঅ্যাপ, ইনসটাগ্রামের মত social Networking sites গুলির দৌলতে আমরা আজ অদ্ভুত এক অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। অজানা মানুষটিকে জানতে বুঝতে এখন বোধ হয় তার মনের হদিস না পেলেও চলে,আমার সামনের মানুষটির পরিধেয় পোশাকটিই যেন তার আসল পরিচয়। অজানা অচেনা মানুষের ভিড়ে সেই ব্যক্তিটিই চোখ টানে যার dressing scence সবচেয়ে আলাদা, যার style statement এক কথায় লাজবাব। Instagram, facebook এ সুন্দর পোশাকে দারুন সেজে যে নিজের ফটো আপলোড করেছে তার ছবিতেই আগে লাইক দেব, whatsapp এও তার নম্বরটিই আগে চাইব। পাশের সাধারণ পোশাকের সাধারণ মানুষটির জন্য তাই no entry ই বরাদ্দ। অর্থাৎ ব্যক্তি মানুষটি এখানে গৌণ। বর্তমান দেখনদারি সর্বস্ব দুনিয়ায় পোশাকের হাত ধরে বাহ্যিক রূপটিই মুখ্য হয়ে উঠছে।

মুখ-মুখোশের এক অদ্ভুত মিশেল, যেখানে অবয়ব ছেড়ে মুখ লুকানোর মুখোশে পরিণত হচ্ছে পোশাক। নিজের অজান্তেই আপাত নিরীহ সেই পোশাক আজ ব্যবহৃত হচ্ছে মুখোশ রপে।

যদিও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই পোশাকে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলা, দশের মাঝে নিজেকে একটু অন্য ভাবে present করা, এতে দোষের কিছু নেইparty3। এটা ব্যক্তি মানুষের স্বাভাবিক আচরণ, বরং রুচিসম্মত পোশাক মানুষের ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট করে প্রকাশ করে। কথায় আছে মানুষের মনের মতন গভীর এ দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় কিছু নেই। অতল সেই গভীরতার তল খোঁজা কঠিন,বৃথা। আর এই দুরন্ত গতির যুগে কেই বা কার মনের হদিস রাখতে চায়!

আর এখানেই সম্ভবত ব্যক্তিমননকে টেক্কা দিচ্ছে পোশাকি দেখনদারি। একজন মানুষের অস্তিত্ব, প্রথম ও প্রাথমিক পরিচয়ের সোপান হয়ে উঠছে পোশাক। ব্যক্তি মানুষটিকে জানতে বুঝতে এখন বোধহয় আর সেই মানুষটার মানসিকতা জানার প্রয়োজন পড়ে না,বাহ্যিক পোশাকই এখানে শেষ কথা। আসলে এইসময়টা হল মুখ-মুখোশের এক অদ্ভুত মিশেল, যেখানে অবয়ব ছেড়ে মুখ লুকানোর মুখোশে পরিণত হচ্ছে পোশাক। নিজের অজান্তেই আপাত নিরীহ সেই পোশাক আজ ব্যবহৃত হচ্ছে মুখোশ রপে।  আর রক্ত-মাংসের আসল মানুষটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে,লুকিয়ে যাচ্ছে চাকচিক্যে ভরা,সুনিপুণ ভাবে বোনা,উজ্জ্বল,বাহারি নিত্যনতুন চোখ-ধাঁধানো সব পোশাকের পর্দার আড়ালে।

বহুজাতিক রেস্তোরাঁ, পাব,বার, কিংবা শহরের অভিজাত ক্লাব – পোশাক-মাহাত্য এখন সর্বত্র চোখে পড়ে। পোশাক perfect তো entry ও perfect। বিবর্তন বাদের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন বেঁচে থাকলে তার Natural selection তত্ত্বের আদলে এই আধুনিক যুগের ‘পোশাকি কাহন’ নিয়ে নয়া কোন তত্ত্ব লিখতেন কি ?