ফেসবুকের ভবিষ্যৎ কী?

482

টানা আটদিন সম্রাটকে নিজের মনের কথা বোঝাতে গিয়ে ফেল্টু মেরেছে শ্রেয়া। শেষটায় কেঁদে কেটে রনে ভঙ্গ দিয়েছে সে। এখন অন্যকারও মুখাপেক্ষী হয়ে ফেসবুক চষে ফেলাই লক্ষ্যমাত্রা তার। একই অবস্থা অভিজিতেরও। বারবার চেষ্টা করেও বসের মনজয় করতে পারেনি সে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ভালোভালো স্ট্যাটাস দেওয়া থেকে শুরু করে গত শনিবারে বসের ঘনিষ্ঠ হয়ে তোলা ছবি পোস্ট করেও চিড়ে ভেজেনি।

নীলোৎপল বিশ্বাস
নীলোৎপল বিশ্বাস

জাম্পকাট, পঞ্চাশোর্দ্ধ স্বপন দাশগুপ্ত। ফুড কর্পোরেশনের চাকুরী জীবন পার করে এখন অবসরের সেকেন্ড ইনিংস খেলছেন তিনি। বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকতে থাকতে ফেসবুকের ঝটিতি সফর, এটাই দৈনিক রুটিন তাঁর। কিন্তু কিছুতেই যেন নিজেকে মেলাতে পারছেন না তিনি। ফেসবুককে কোথাও যেন তিনি আপন করে নিতে পারছেন না। তাঁর কথা নাকি এখানে কেউ বোঝে না। একা স্বপন বাবু, অভিজিত বা শ্রেয়ার নয়। এই অবস্থা ফেসবুক প্রেমী কমবেশি সকলেরই। লেখা, ছবি, স্মাইলি, ফাইলি(পড়ুন মজার ফাইল), হাসা-হাসি, তক্কো-বিতক্কো, কামড়া-কামড়ি, কিছুতেই যেন মন ভরছে না ফেসবুক থেকে ট্যুইটার ব্যবহারকারী সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ভক্তদের। তাহলে উপায়?

এ প্রশ্নের উত্তর পাড়ার মেজকাদার কাছে জানতে চাওয়া ঘোরতর অন্যায়। অন্যায় হওয়ার আগেই অবশ্য বাঁচিয়ে দিলেন খোদ ফেসবুক স্রষ্টা মার্ক জুকারবার্গ। বিগত কয়েকমাস তিনি নিজেই চেয়ার পেতে বসেছিলেন ইউজারদের প্রশ্নের উত্তর দিতে, ‘ফেসবুক লাইভ’-এ। জনসংযোগের নতুন মোড়ক না গুষ্টির পিণ্ডি, সে আলোচনা তোলা থাক অন্যদিনের জন্য। তা সেই জনতা দরবার বসেছিল জুনের ৩০ তারিখেও। সেখানেই তাকে এক গ্রাহক সদর্পে প্রশ্ন করলেন, ২০০৪ সাল থেকে তো অনেক হল, ফেসবুকের ভবিষ্যৎ কী? facebook-2

বাবা, সে প্রশ্ন শুনে যা উত্তর দিলেন বর্তমান টেক স্যাভিদের পরম ভগবান তাতে দাঁত-কপাটি সাক্ষাৎ হিটকি লেগে যাওয়ার যোগাড়। বললেন, “এখন মানুষ ফেসবুকে লেখেন, ছবি দেন। ছবি, স্মাইলি বা ভিডিওই এখন কমিউনিকেশনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এমন দিন আসছে, যেখানে ভিডিওই সব হয়ে উঠবে।” এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। তবে খানিক থেমে জুকারবার্গ মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত এক কথা বললেন, তাঁর কথায়, “ফেসবুকের ভবিষ্যৎ একজনের ভাবনা ছবি, লেখা ভিডিও ছাড়াই অন্য জনের মাথায় পৌঁছে দেওয়া। ছবি, লেখা, ভিডিও, স্মাইলির মতো সাইন ও তা থেকে সৃষ্ট কোডের আর প্রয়োজন নেই।”

মোদ্দা কথা দাঁড়াল, আমি মনে মনে যা ভাবছি তা আমার মাথা থেকে বার্তা হয়ে পৌঁছে যাবে আমার প্রেয়সী বা সখার মাথায় ও সে আমার মনের কথা বিনা ভাষায়, সাইনে, কোডে বুঝে ফেলবে। আর দরকারই নেই সাইন, কোড, মিথ বা সংস্কৃতরও। তবে কী একটাই মিথ থাকবে যে যন্ত্র সব পারে?

ফেসবুক স্রষ্টা যা বললেন তা শুনে হঠাৎ মনটা ছুটে গেল ইনসেপশনের পর্দায়। যেখানে লিওনার্দো দ্যা ক্যাপ্রিওর ভাবনা ধার করে চলে চুরি, ডাকাতি বা স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন দেখে নিজের জগৎ তৈরি। তবে কী আগামী দিনের কমিউনিকেশন ভবিষ্যৎ এটাই?

ব্রিটিশ প্রফেসর, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক, ক্রিস্টোফার জেমস বলছেন, “হতেই পারে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ব্রেন-টু-ব্রেন কমিউনিকেশন হবে অনেকটা ডিআর হেডসেটের মতো। সাধারণ ব্রেন বৈদ্যুতিন ও রাসায়নিক(কেমিকেল) সিগনালের মাধ্যমে নিউরনের মধ্যে দিয়ে তথ্য পাঠায়। ফাংশানাল ম্যাগনেটিক রিজনেন্স ইম্যাজিংয়ের(এফএমআরআই) মাধ্যমে সেই তথ্যগুলি দেখা যায়। সুতরাং থিওরিটিক্যালি ব্রেনের সিগন্যালকে বিটে এনকোড করা সম্ভব। আর তা করা গেলেই ভাবনাকে যন্ত্রের মাধ্যমে এক মস্তিষ্ক থেকে আর একটিতে পাঠানো যাবে অনায়াসে।” বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন মোটর কর্টেক্স(MOTOR CORTEX)। সিগনাল নেওয়া, ডিকোড করা ও প্লে-ব্যাক করে ভাবনা পড়া। তাহলেই কেল্লা ফতে। তবে সহজ ভাবলে এতটা কি সহজ গোটাটা? facebook-6

জেমস নিজেই বলেছেন, স্কালপের ভাবনা ইলেকট্রোডেস(Electrodes) পদ্ধতিতে ভিন্ন মস্তিষ্কে পৌঁছলেও কেবল সেলুলার অংশের ভাবনা পড়তে পারে বিপরীত মস্তিষ্ক। আর যা অবশ্যই হতে হবে লাউড নয়তো সব চেষ্টাই যাবে বিফলে। আরও একটি বাধার কথা শুনিয়েছেন পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো বায়োলজিস্ট বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু সোয়ার্থজ। তাঁর কথায়, “আসলে মস্তিষ্ককে বুজতে হবে আসল ভাবনা কোনটা? আসল ভাবনাটাকেই চিহ্নিত করতে না পারলে সেটাকে ব্যাক্ষা করবে কী ভাবে?”

এতকিছুর মধ্যেও জুকারবার্গকে আশা দেখাচ্ছেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তারা কম্পিউটারের মোটর কোর্টেক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে সফল ভাবে ভাবনা পাঠাতে শুরু করেছেন। সেখানে একজন শুয়ে ভাবছেন, অন্যজন সেই ভাবনাতেই ভিডিও গেমস খেলছেন।

তাহলে? আশায় বুক কী বাঁধা যায়? উত্তর অবশ্যই সময়ের ঝোলাতে। ভাবনাকে হাতিয়ার করে নতুন মিডিয়াম তৈরি হলে আর যাই হোক ভাবনা বোঝানর ছুঁতোয় কয়েকটা চাকরি তো হবে! বলা তো যায়না হতেই পারে নতুন ‘ভাবনা সংবাদে’র জন্ম। সিভি তৈরি রাখুন, মাথায় লিখবেন, “ভাবনা বোঝানোর চাকরি চাই।”

এই বিভাগের আরও প্রতিবেদন:

“অ্যাপেল খাবা? তাতে যে কত্ত ম-জা!!

বাজার কাঁপাবে যে সমস্ত স্মার্টফোন

এবার থেকে ব্রাউজার হিস্ট্রি ডিলিট করলে জেল