স্বপ্ন ও পূরণের বিভাজিকায়

854

প্রতিবেদন: সরোজ দরবার

চাকরি আর এমপ্লযমেন্ট কি এক? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্ররোচণা দেয় চাকরির জালে জড়িয়ে যেতে৷ সেখানে নিজস্ব স্বপ্নের কোনও উড়ান নেই৷ সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও সেই ছকে বাঁধা৷ কিন্তু এই ছক থেকে কি মুক্তি নেই? সকলেই পারেন না, তবু কেউ কেউ তো পারেন স্বপ্নকে বাস্তবের রানওয়েটিকে দেখিয়ে দিতে৷লিখছেন সরোজ দরবার৷

‘Even people with job are unemployed. In fact, most people with jobs are unemployed. I can say, Happily and gratefully, That I am fully employed’

লিওনার্ড কোহেন
লিওনার্ড কোহেন

বলছেন লেওনার্ড কোহেন। প্রশ্ন করা হয়েছিল গান তৈরির ‘হার্ড লেবার’ কতটা ধকল দেয় তাঁকে? উত্তরে অনেক কথার মধ্যে তিনি বলেছিলেন এই কথাটি। এবং বলামাত্র চাকরি বা তথাকথিত এমপ্লয়মেন্ট সম্পর্কে প্রথাগত ধারণাটির দেওয়াল থেকে পলেস্তরা ঝরে পড়েছিল ঝুর ঝুর করে। গতে বাঁধা কিছু পড়াশোনা অন্তে চাকরির ফর্ম খামে ভরে আশায় আশায় বসে থাকা যুবককুলের কারও কারও কপালে শিকে ছেঁড়া মাত্র যে এমপ্লয়েডের গৌরবটীকা ললাটে ধরে পাত্র-পাত্রী বাজারে গিয়ে বসা- এই সিস্টেম কোহেনের এই মন্তব্য শুনে বেদম বিষম খেতে পারে। আহা! এমন সোনার চাকরি, গলায় সোনের চেন, পাত্রীর বাবা হেঁ হেঁ করে মাথা নোয়াচ্ছেন, তা কিন এমপ্লয়েড নয়। কোহেন, তাঁর স্বভাজাত ভঙ্গিতে আগেই তো বলেছেন, ‘The mental physique is muscular. That gives you a certain stride as you work along the dismal landscape of your inner thoughts. You have a certain kind of tone to your activity. But most of the time, it dosen’t help. Its just hard work.’

আমরা এক লহমায় বুঝতে পারি, যে মানসিক গঠন , এবং যে দাগ রেখে যাওয়া কাজকে তিনি এমপ্লয়মেন্ট বলে বোঝাচ্ছেন, আমরা, এই চলতি সিস্টেমের গিণিপিগরা তার থেকে বহু বহু দূরে।

ঠিক এখানেই মনে হয় সকলেই কি আর ‘রক্তকরবী’র ক্রমিক সংখ্যার মজুরের মতো?

‘ক্যাকটাস’-এর সিধুও যে ডাক্তার তাও অনেকে জানেন৷ জানেন গায়ক পল্লব কীর্তনীয়াও একজন ডাক্তার৷ উপরে যে কবির কবিতার অংশ পড়লেন, সেই কবি শ্রীজাতও তো নিজের স্বপ্নকেই এগিয়ে নিয়ে চলেছেন

 আজকের কর্পোরেট সংস্কৃতিতে গলায় বকলেস বাঁধা সেই সংখ্যা নির্ভর মজুরে পরিণত হতে চেয়েছিলেন? নিঃসন্দেহে উত্তর আসবে-না। কেউ কেউ চেয়েছিলেন, স্বপ্নের উড়ান। কিন্তু এই সিস্টেম তার ডানা ভেঙে দিতে দু’মিনিট দেরি করে না। এবং সে পক্রিয়া শুরু হয়ে যায় তার অজান্তেই, যখন জীবনের লক্ষ্য নামক রচনায় সে লিখতে শেখে সে বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক ইত্যাদি ইত্যাদি গালভরা গুরুগম্ভীর কিছু হবে। না কোনওদিন কোনও রচনা তাকে শেখায় না যে, বড় হয়ে তুমি গায়ক বা চিত্রশিল্পী হবে। রবি ঠাকুর মাথায় থাকুন, প্রতি ২৫শে ২২শে বাঙালি তাঁকে ধুপ ধুনো দিয়ে পুজো করে, বর্ষায়-অন্ধকারে-প্রেমে-পা পিছলোনয় তাঁকে প্রতিক্ষণের সঙ্গী করে সংস্কৃতির ধ্বজা উড়ানো পিতৃকুলও তাদের সন্তানকে বলবে না যে, বড় হয়ে তুমি লেখালিখি কর। বলা ভালো, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় তাঁদের মুখে কুলুপ এঁটে দেয়। কেননা, ছেলে দুধে-ভাতে থাকবে- এইই ঈশ্বরী পাটনীদের চিরকালের প্রার্থনা। সুতরাং যে স্বপ্ন খেতে দেয় না, তার দাম না থাকাই স্বাভাবিক। এবং এটাও ভাবার, যে জাতি সংস্কৃতির নামে গর্ব করে বুক বাজায়, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ন্যূন্যতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে সে আজও অক্ষম।

যাকগে, এ নিয়ে দেশের পণ্ডিতরা কচলাকচলি করেছেন, এবং করে চলবেনও। কিন্তু সেই স্বপ্নের কী হল। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির বিভাজিকায় এতক্ষণে যে হতাশার ঘাম জমে উঠেছে। তোতার পেটে পুঁথির পাতা পোরা শেষ হলে একদিন চলতি ব্যবস্থা আশীর্বাদ করে বলে, তোমার শিক্ষা শেষ হয়েছে৷ এবার,

‘‘বাড়ির লোকের উত্তেজনা-‘কেন কিছু একটা করছ না?’

যেন আজো বেকার আছি শখ করে

তবু এমন দেশপ্রেম, যে এমপ্লয়মেন্ট-এক্সচেঞ্জে

নাম লিখেছি সোনাবরণ অক্ষরে’’

এর বাইরে বেরনো মানেই সর্বনাশ৷ এদিকে শেক্সপিয়র সাহেব বলছেন, ‘Our wills and fates do so contrary run / …. / Our thoughts are ours, their ends none of their own”

অতএব বোঝো ঠ্যালা৷ স্বপ্ন নামক মাল নিজের দায়িত্বে রাখুন এবং গলায় বকলেস ঝুলিয়ে রাষ্ট্রের চাকর হও৷ এবং যারা হতে পারল না, তাঁরা আজীবন ভাগ্যকে দোষারোপ আর সিস্টেমকে খিস্তি দিয়ে যাও৷ এর ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু খেতে পাওয়ার গ্যারান্টি কোনও ভারতভাগ্যবিধাতা আজও দিতে পারেন না৷

uttam-kumarতবু খেয়াল করলে দেখব যে, সত্যিই তেমন অসুবিধা হয়না৷ বাঙালির স্বপ্নপূরণের অতিবড় সওদাগর স্বয়ং উত্তমকুমারই তো ক্লার্কের চাকরি করতেন৷ ভাগ্যিস অভিনয়ের স্বপ্নটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, ফ্লপ হতে হতেও নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, নইলে বাঙালির ইতিহাস কেমন হত, তা আজ আন্দাজ করা মুশকিল৷ একদা মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের ভারি ব্যাগটা নামিয়ে হোটেলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যিনি নিজেই নিজের কাজ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, এবং ব্যাগটি চিরকালের জন্য নামিয়ে রেখেছিলেন, আমরা জানি সেদিনের সে যুবকের নাম মৃণাল সেন৷ এই যে মাদ্রিদে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পেলেন যে বাঙালি অভিনেতা, পরপর তিনবার যাঁর ছবি জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত, সেই ঋত্বিক চক্রবর্তীও তো পেশায় মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভই ছিলেন৷ ছোটপর্দার রিয়্যালিযটি শোয়ের দৌলতে আজ আর কারও জানতে বাকি নেই যে ইউফোরিয়া’র পলাশ সেন একজন ডাক্তার৷

সিধু (Cactus)

‘ক্যাকটাস’-এর সিধুও যে ডাক্তার তাও অনেকে জানেন৷ জানেন গায়ক পল্লব কীর্তনীয়াও একজন ডাক্তার৷ উপরে যে কবির কবিতার অংশ পড়লেন, সেই কবি শ্রীজাতও তো নিজের স্বপ্নকেই এগিয়ে নিয়ে চলেছেন৷ যেমন অয়নাংশু বন্দ্যোপাধ্যায়, পেশায় যিনি  ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশেও কাটিয়েছেন কর্মজীবন, তিনি কিন্তু ছবি বানানোর স্বপ্নটিকে ক্রেডিট কার্ডের ভিতর পুরে ফেলেননি। আমরা দেখেছি তার ‘বোধন’৷সৃজিৎ ও অনুপমও তাদের স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দিয়েছেন। সাহিত্যিক নবকুমার বসু যে পেশায় ডাক্তার ছিলেন তাও জানেন হয়ত অনেকেই৷ স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন ছিলেন  shipping firm in Bird & Co International এর একজন কর্মীমাত্র, প্রথম মাসে বেতন পেয়েচিলেন মোটে ৫০০ টাকা৷ আর রজনিকান্ত তো কাঠের কাজ থেকে বাস কন্ডাক্টর কোনও পেশাকেই বাদ দেননি, জীবন তাঁকে দিয়ে বহু ঘাটের জল খাইয়েই অবশেষে দেশের সুপারস্টার হওয়ার ছাড়পত্র দিয়েছে৷যিনি আক্ষরিকভাবেই জীবনের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন, তিনি যে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ হবেন এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে! যে শান্তনু মৈত্রর সুরে ভেসে যান, তিনিও একদা পেশায় ছিলেন অ্যাড এজেন্সির মার্কেটিং বিভাগের কর্মী৷ এঁরা তাঁদের বর্তমান পেশার নিরিখে প্রচারের আলোয় থাকেন, ফলত এঁদের কথা অনেকেই জানতে পারেন৷ কিন্তু এর বাইরেও অনেকে আছেন যাঁরা নিজেদের স্বপ্নকে মেরে ফেলেননি৷ ব্যক্তিগতভাবে রোহণ কুদ্দুসকে চিনি, যিনি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হয়েও, প্রকাশনা সংস্থা তৈরি করেছেন এবং সানন্দে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন৷ এরকম অনেকে আছেন, অনেকের নাম আমি জানি না, আপনারা জানেন৷  srijato

সুতরাং স্বপ্ন যে তার উড়ানের রানওয়ে বাস্তবের মাটিতে খুঁজে পায় না তা নয়৷ প্রয়োজন শুধু ইচ্ছেশক্তির৷ আসলে এই ব্যবস্থা তার আগ্রাসন তো চালাবেই৷ সেটিই স্বাভাবিক৷ সেই বৃত্তের বাইরে বেরনো সহজসাধ্য নয়, কিন্তু অসাধ্যও নয়৷ ছায়াছবি যা মেলোড্রামায় সম্ভব করে তোলে, বাস্তবেও তা সম্ভব, যদি ব্যবস্থা-বৃত্তের পরিধির আর একটু কাছে পৌঁছনো যায়৷ তাহলে পরিধির ওপারটাও দেখা সম্ভব৷ একদা এক বাবা তাঁর সন্তানের শিক্ষককে বলেছিলেন, ‘‘In school,teach him to know that it is more honorable to fail than to cheat.’’ বলা বাহুল্য আব্রাহাম লিঙ্কন সাহেবের এ কথা আমাদের স্কুল কোনওদিনই মানে না৷ মুখে যাই বলা হোক না কেন, আসলে আমাদের তথাকথিত শিক্ষা এই ব্যবস্থা জালের অন্দরে ঢোকানোর রাস্তাটিই আমাদের দেকিয়ে দেয়৷ স্বপ্নের সঙ্গে জরুরী অন্তর্ঘাত যদি সেরে ফেলতে পারে আমাদের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, যদি পড়ে যাব তবু হেরে না যাওয়ার মানসিকতা মাথা তুলে দাঁড়ায়, তবে না হওয়ার কিছু নেই৷ লিঙ্কন সাহেব সেই চিঠিতে আরও লিখেছিলেন, ‘‘ Let him have the courage to be impatient and let him have the patience to be brave.

Teach him always to have sublime faith in his creator and faith in himself too, because then he will always have faith in mankind..’’.

এই বিশ্বাসটুকুতেই বোধহয় সব সম্ভব৷ নচেত এই পোর্টাল মারফত এই কলমচির লেখাও বোধহয় আপনার কাছে কখনওই পৌঁছত না৷