তথ্যপ্রযুক্তির মিশন ইমপসিবলে এখন ভারতীয় সেনাও মাহির

1298

মিশন ইমপসিবলের সেই ঘড়িটার কথা মনে পড়ে? কিংবা নায়কের কানে গোঁজা সেই মাইক্রো হেডফোনটা? আইফোনের সেই ভয়েস ডেটার কারসাজিটা নিশ্চয় মনে রয়েছে? খুব দূরের হয়ে যাচ্ছে! বাদ দিন। ‘বাদশা’ সিনেমার শাহরুখ খানকে আন্ডারকভার এজেন্ট ভেবে দেওয়া জুতো, বন্দুক গাড়ি, চিবানো বোমাগুলি নিশ্চয়ই স্মৃতিতে আছে? আর, মারভেল কমিকসে গল্পের গোরু গাছে-চড়ানো টেকনোলজি নির্ভর এলিয়েনদের সঙ্গে পৃথিবীর সেনার লড়াই! ভাবনায় তাল ঠুকে বের করার মতো উদাহরণের অভাব নেই। কিন্তু বাস্তব? বাস্তবটা ঠিক কী রকম?

নীলোৎপল বিশ্বাস
নীলোৎপল বিশ্বাস

 স্বাধীনতার ৬৮ বছর ধরে সীমান্তে সুরক্ষা দেওয়া অকুতোভয় মানুষজনের জীবনটা ঠিক কেমন? অস্ত্র হিসেবেই বা কী কী হাতে থাকে তাঁদের? যুদ্ধের ময়দানে কেমনভাবে বলা হয় একের কথা অন্যকে? আন্তর্জাতিক সুরক্ষার বজ্রআঁটুনি ভেঙে যেটুকু বের হয় তাতে পাঠকদের মন খিদে মেটানো কঠিন। ডেডলাইন মিস হওয়ার আগে ছোট করে সেসবই তুলে ধরলাম।

কাশ্মীর সীমান্তে হঠাৎ পাক হামলা। গাছ-লতাপাতার ক্যামোফ্লেজের আড়ালে কয়েকজন সেনা জওয়ানের উপর দায়িত্ব পড়েছে প্রাথমিক যুদ্ধের খবর আনার। হাড়হিম করা ঠান্ডার মধ্যে খানিক এগিয়ে-পিছিয়ে একে অপরকে কর্ডন করে এগিয়ে চলেছেন তাঁরা। পুঞ্চ সেক্টর লাগোয়া ভারতীয় চৌকি ততক্ষণে ধূলিস্যাৎ। হঠাৎ প্রয়োজন পড়ল নজফগড়ের এক তরুণ সহযোদ্ধাকে ডাকার। একটু অস্ফুট শব্দ যেখানে প্রাণ কাড়তে ওত পেতে রয়েছে সেখানে কথা বলার উপায় কী? কিছু সিগন্যাল, কিছু চিহ্ন, আর কিছুটা অঙ্গভঙ্গিতে দু’-চার কথা বোঝানো গেলেও গোটাটা বোঝানো অসম্ভব। তাহলে উপায়?

স্বাধীনতার পর জেনারেল বেদপ্রকাশ মালিকের নেতৃত্বে সেই প্রথম পড়শি দেশকে রুখে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। সাল ১৯৯৯। পারভেজ বাহিনীকে খেদাতে আগ্নেয়াস্ত্র অনেক থাকলেও কমিউনিকেশন হাতিয়ার কোথায়? যা কি না যুদ্ধ জেতার আসল অস্ত্র! সরকারি হিসাবে, ওই যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ৫২৭ জন। আহত প্রায় ১৩৬৩ জন। এঁদের বার্তালাপের উপায় কী ছিল? tele-3

অথচ, তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যমে বিপ্লব ঘটে গিয়েছে তার আট বছর আগে, ১৯৯১ সালে। তবু পরের বছরগুলিতে দেখা গিয়েছে, মোটের উপর প্রাগৈতিহাসিক কমিউনিকেশন সিস্টেমে ভর করে রয়েছে ভারত। সামরিক ক্ষেত্রে প্রথম উন্নত কমিউনিকেশন ব্যবস্থা যারা চালু করেছিল, সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন অতীত। ভারতের হাতে রয়ে গিয়েছে তাদেরই তৈরি ১৯৩৪ সালের ডিজিটাল সিগন্যাল। এই অবস্থায় পরের আট বছরে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে কেবল ছয়টি পদ্ধতি।

১. আলট্রা মেজারমেন্ট সিস্টেম।

২. ক্রিপটোগ্রাফি।

৩. মিলিটারি রেডিও সিস্টেম।

৪. নিউক্লিয়ার কমান্ড কন্ট্রোল।

৫. সিগন্যাল কোর। এবং,

৬. নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক ওয়রফেয়ার।

প্রথম ব্যবস্থাটা কেবল অ্যালার্ট করেই ক্ষান্ত। এক সময় যুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল এটি। দ্বিতীয়টি চালাকচতুর কোড তৈরিতে ওস্তাদ। জরুরি বার্তাকে বিভিন্ন গোপন সংকেতে বদলে চালান করে দেয় অভীষ্ট লক্ষ্যে। মিলিটারি রেডিও আবার সঠিক লোককে তথ্য পাঠাতে মাহির। ক্রিপটোগ্রাফির আরও গুণ৷ তা ডিজিটাল তথ্য ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করতেও ব্যবহৃত হয়। তার চাইতেও বড় কথা, একইসঙ্গে ভাঙতে পারে শত্রুপক্ষের কোড৷বাকি সবকটিই মোটের উপর রেডিও সিগন্যাল।

যুদ্ধের ইতিহাসজর্জর পৃথিবী বহুদিন ধরেই শান্ত। যদিও যুদ্ধপিপাসুদের সতত পদধ্বনি আজও শোনা যায়। অনিদ্রার রাতে প্রায় সকল রাষ্ট্রনায়কই কমবেশি পরের দেশ দখলের ছক কষছেন। পার্থক্য একটাই, কেউ দেশ দখল করতে চান বোমা মেরে, কেউ আবার দেশ-কালের সীমানা ভেঙে, কেউবা মগজে কার্ফু জারি করে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্লান্তি নেই তথ্য-প্রযুক্তি মাধ্যমের একের পর এক বিপ্লব তরঙ্গের। আগামী দিনের যুদ্ধ ও যুদ্ধাস্ত্রের এই মাধ্যম ব্যবহার কী পর্যায়ে হবে, সে তথ্যের হদিশ আপাতত বাঘা বাঘা দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, প্রযুক্তিবিদ আর কালের দখলে। tele-5

সেই সময়টা কি আমাদের খুব কাম্য? হয়তো নয়৷ তবু যত দিন না সব যুদ্ধ থেমে যাচ্ছে, যত দিন পর্যন্ত সব রণক্ষেত্র ঘাসে ছেয়ে না যাচ্ছে, যত দিন না দেশে রাইফেলগুলোয় জং ধরছে, যত দিন পর্যন্ত না ট্যাঙ্কের বুকে শিশুরা খেলা করছে, তত দিন এই তথ্যপ্রযুক্তিতে পাল্লা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় শামিল হতে বাধ্য ভারতের সেনাবাহিনীও৷ প্রতিনিয়ত চলছে তার গবেষণাও৷tele-8