বন্ধু-Gone!

763

“উৎসবে ব্যসনে চৈব দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে
রাজদ্বারে শ্মশানে চ যতিষ্ঠতি সবান্ধবঃ”

 

অরিত্রিক দত্ত চৌধুরী
অরিত্রিক দত্ত চৌধুরী

উৎসব থেকে শ্মশানঘাটে যে সঙ্গী হবে সেই-ই বন্ধু, যে সহ্য করবে সমস্ত পাগলামি, আত্মহননের পথ থেকে ফিরিয়ে আনবে আত্মজিজ্ঞাসায়, সেইই নাকি বন্ধু। উৎসবের চাকচিক্য সত্ত্বেও যে তোমার চোখের জলের ফোঁটাকে আলিঙ্গন করবে মুক্তকণার মতো, সেই-ই বন্ধু। কিন্তু ২০১৫-র একটি বিকেলে দাঁড়িয়ে বন্ধুর ডাক শোনা যায় রিংটোনে, দেখা হওয়ার উচ্ছ্বাস আজ স্মাইলিরূপে বন্দি। আলিঙ্গনের উষ্ণতা পরিণত হয়েছে বন্ধুত্বের ভস্মমাখা তিলকে— কারণ প্রযুক্তি।

“পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে স্যাটেলাইট আর কেবিলের হাতে ড্রইংরুমে রাখা বোকাবাক্সতে বন্দি”, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতার স্পর্শ খুঁজতে যেতে হবে আলোকবর্ষ দূরে। সুজয় প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করছিল ধর্মতলার মোড়ে, এত বছর পর দেখা হবে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে…, বেজে উঠল সভ্য মানুষের সেই ক্রন্দনমূখর শিশুজাতক—মোবাইল। অভি ওপার থেকে বলল, “এত গরমে ভিক্টোরিয়া যাবি? তার চেয়ে সিটি সেন্টার চলে আয়, এসি আছে।‍‌‌‌‌‌”

পাশ্চাত্য কালচারের তান বজায় রেখে দু’-একজন রাত বারোটায় তার কাঁচাঘুমের বারোটা বাজিয়ে ‘শুভ জন্মদিন’ জানিয়েছিল বটে, তবে সময়জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে ধরনটাও সাহেবি হয়ে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল— “Haappieee Budday!” ভুল ইংরেজিতে অধিকতর vowel-এর প্রয়োগ করে ফুলের কুঁড়ির দিনের বেলা মূত্র বিসর্জনের কারণ (Haa-pee-bud-day) খুব একটা বোধগম্য না হলেও, সোমরসের মধুমাখা গলায় বন্ধুদের অভ্যর্থনা খুব একটা মন্দ লাগেনি তার।

সুজয় হতবাক্। বাদামের ঠোঙা হাতে মেয়ে দেখব, সানগ্লাসটা চোখে দিয়ে লাস্যময়ী নারীর অভিলাষ হব, কিংবা আঙুলের ফাঁকে সিগারেট নিয়ে ঘাস ছিঁড়ে হাওয়ার গতি দেখব, সেটাই তো জীবন ছিল। কিন্তু কী বোকা সুজয়! ও তো ভুলেই গিয়েছে যে, সম্পর্কগুলো আজ এতটা tender নেই যে ছোট ছোট মুহূর্তগুলো share করে স্মৃতির রাজপ্রাসাদ গড়বে। এখন তার বন্ধুরা corporate। ‘Tender’ কল করে share মার্কেটে নিজেদের লাভক্ষতির হিসেব করতেই তারা বেশি উৎসাহী । এই সুন্দর শব্দগুলোর বাণিজ্যিকরণের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের উষ্ণতা বন্দি হয়েছে Archies-এর বাতানুকূল ঝাঁ-চকচকে দোকানঘরে। যে বন্ধুরা দল বেঁধে নিজেরা হাতে তৈরি করে Greetings Card দিত, তারাই আজ e-Bayতে উপহার পাঠিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সাহচর্য? সাথে থাকার মুহূর্ত ? পাশে থাকার প্রত্যয় ? কাছে থাকার আশ্বাস? সেগুলো কি কোনও উপহার নয়? সেগুলো কি স্মৃতির দরজার প্রহরী হয়েই থেকে যাবে বাকি জীবন ? নাকি কখনও কড়া নাড়বে মনের অন্তঃপুরের খিড়কিতে?

kidsহঠাৎ ‘ঢং ঢং’ করে বেজে উঠল অস্তিত্বের ঘন্টা। Whatsapp-এ মৌলি জানাল, “আজ আসতে পারছি না রে, খুব পায়ে ব্যথা। ” স্থাপত্যের শিরদাঁড়ায় এমন চিড় কবে ধরল, সুজয় বুঝতেই পারেনি। ও যখন অত দূরে বসে সমস্ত গল্প stock করছিল বন্ধুদের জন্য, বন্ধুরা তখন stock বিকিকিনি করে নিজেদের দর যাচাই করতেই ব্যস্ত।

পাশ্চাত্য কালচারের তান বজায় রেখে দু’-একজন রাত বারোটায় তার কাঁচাঘুমের বারোটা বাজিয়ে ‘শুভ জন্মদিন’ জানিয়েছিল বটে, তবে সময়জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে ধরনটাও সাহেবি হয়ে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল— “Haappieee Budday!” ভুল ইংরেজিতে অধিকতর vowel-এর প্রয়োগ করে ফুলের কুঁড়ির দিনের বেলা মূত্র বিসর্জনের কারণ (Haa-pee-bud-day) খুব একটা বোধগম্য না হলেও, সোমরসের মধুমাখা গলায় বন্ধুদের অভ্যর্থনা খুব একটা মন্দ লাগেনি তার। কিন্তু তাদের হাত ধরাধরি করে জেব্রা ক্রসিংয়ে কিত কিত, বা দিগভ্রষ্ট ট্যাক্সিওয়ালার ভ্রান্তধারণায় উসকানির এইভাবে ব্যান্ড বাজিয়ে দিল ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের শতাব্দী ? ‘পথের সাথী’ কি কেবল বিড়ির কোম্পানি? তাহলে বন্ধুরা কে? শিশিরবিন্দুর মতো ক্ষণস্থায়ী স্বপ্ন, নাকি শেষপাতের চাটনি? বন্ধুরা কি তবে বাকিজীবন মৃত্যুপথযাত্রী প্রাণের হদস্পন্দনের শেষ অক্ষরেখা হয়েই থেকে যাবে? গতির পথ অবরুদ্ধ না করলে স্মৃতির পথ কি এভাবেই হবে অবলুপ্ত?friends1

সুজয়ের চোখটা ঝাপসা হয়ে আসতেই মাথার পিছনে পড়ল একটা চাঁটি— চিরকালের লেটলতিফ রুদ্র এতক্ষণে এসে হাজির। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল সুজয়ের, চোখের জলের কারণ জানতে পারায় রুদ্র বলল, “তুই জানিস্ না, এত pollution বলে আজকাল সবাই রাস্তায় হাঁটা একটু avoid করে। ওভাবে কী দেখছিস? সিঙাড়া? Too oily. তেলেভাজার substitute এখন pizza আর burger। ”
বিস্মিত সুরে সুজয় বলল, “আর আমাদের ভুট্টামাঠের পথ (Cornfield Road), আমাদের স্কুলের পিছনে পাঁচিলে-ঘেরা Eden Gardens-এ তোরা আর যাস না?” রুদ্র বলল, “ওখানে তো এখন অট্টালিকা। আর কম্পিউটারে Fifa থাকতে মাঠে নেমে ফুটবল-ক্রিকেট খেলার সময় কই?” বাড়ীতে বড় LED কিনেছি রে, এখন আর হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হয় না। বাড়িতে আসিস্। দেখাব। ”

একা হাঁটতে হাঁটতে সুজয় ভাবছিল, কোনটা বেশি অচেনা? শহরটা নাকি বন্ধুরা? কোনটার বদলের গতি বেশি? বিজ্ঞান, না ইতিহাস? ইয়ারফোনের সশব্দ হাহাকারকে স্তব্ধ করে আবিরে রাঙা বাতাসে কবে শোনা যাবে বন্ধনের স্পন্দন? অধরা মাধুরী কি রয়ে যাবে শুধু স্মৃতিপটে, নাকি আবার একদিন শ্বেতপদ্মে অধিষ্ঠিত কোনও এক অত্রিমুনি বাজাবেন পার্থসারথির পাঞ্চজন্য? বন্ধুত্বের ডামাডোলে বেজে উঠবে নতুন ঢাক, দুর্গাপূজায় আবার দল বেঁধে ঠাকুর দেখা!

-অরিত্রিক দত্ত চৌধুরী