মুক্তির মন্দির সোপানতলে

919

tanmoy১৮৫৭-র প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ তার ছাপ রেখে গিয়েছিল৷ তাই পরাধীন ভারতে অগ্নিতর্পণের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠেছে বারংবার৷ তারই কিছু মুহূর্ত তুলে ধরলেন তন্ময় চক্রবর্তী

একটা সময়, বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলনের সময় থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুবসমাজ, দু’টি সমার্থক হয়ে গিয়েছিল৷বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গিয়েছে যুব সমাজকে৷ আত্মবলিদানের নজির তো রয়েছেই, তার সঙ্গে উদ্বুদ্ধ করেছে অন্যদেরও৷শক্তিশালী হয়েছে আন্দোলন৷শুরুটা করা যাক ঊনিশ শতকের শেষের দশক থেকেই৷ সেই সময়, নরমপন্থী কংগ্রেস নেতৃত্বের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে শুরু হয় প্রতিবাদ৷ কংগ্রেসের ভিতরেই উদ্ভব হয় চরমপন্থী গোষ্ঠীর৷ ১৯০৭ সাল, সুরাট অধিবেশনে চরমে ওঠে বিরোধ৷ অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে তরুণরা৷ রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তির অভিযোগ তুলে দেখাতে থাকে প্রতিবাদ৷ সরব হন লালা লাজপত রায়, বিপিনচন্দ্র পাল, বালগঙ্গাধর তিলক, অরবিন্দ ঘোষের মতো ব্যক্তিত্ব৷এই সময়েই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইংরেজদের সীমাহীন শোষণ ও শিক্ষিত ভারতীয়দের বেকারত্ব যুবসমাজকে ইংরেজদের প্রতি আরও বিদ্বেষভাবাপন্ন করে তোলে৷ রাজনারায়ণ বসু, হিন্দু মেলা, শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী, বঙ্কিমচন্দ্রের দেশচর্চার নতুন মন্ত্র, স্বামী বিবেকানন্দ ও দয়ানন্দের বিপ্লবী চেতনা যুব সম্প্রদায়কে নতুন আদর্শে দীক্ষিত করে৷বাংলায় বিপিনচন্দ্র পাল-অরবিন্দ ঘোষ, মহারাষ্ট্রে বাল গঙ্গাধর তিলক, পঞ্জাবে লালা লাজপত রায় ও মাদ্রাজে সুব্রহ্মণ্যম শিব, চিদম্বরম পিল্লাইয়ের বক্তৃতা ও রচনা এবং সুব্রহ্মণ্যম ভারতীর কবিতা যুবসমাজকে প্রভাবিত করে৷ ১৯০২ সালে ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের সভাপতিত্বে গড়ে ওঠে অনুশীলন সমিতি৷ নানা স্থানে গড়ে ওঠে গুপ্ত সমিতি৷আর তাতে যোগদান বাড়ে যুব সমাজের৷ ১৯০৬ সালে গড়ে ওঠে যুগান্তর দল৷

congress surat split
১৯০৮ সাল৷ প্রাণভয়ে মজঃফফরপুরে বদলি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সির ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড৷ তাঁকে হত্যা করতে সেখানেও পৌঁছে যান দুই তরুণ বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসু৷ তবে, কিংসফোর্ডের বদলে মৃত্যু হয় ব্যারিস্টার কেনেডির স্ত্রী ও কন্যার৷এরপর, ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতারি এড়াতে মোকামাঘাটে আত্মহত্যা করেন প্রফুল্ল চাকি৷ সেই বছরই ফাঁসি হয় ক্ষুদিরামের৷অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রে তিলকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু কিশোর গঠন করে ‘বাল সমাজ’৷ এর আগেই বিনায়ক দামোদর সাভারকর গঠন করেন মিত্র মেলা নামে একটি সংঘ৷ অস্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি চলতে থাকে শরীরচর্চা৷ নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা ও জেলাশাসক জ্যাকসনকে হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় সাভারকরের৷ তবে দেশকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে দেশের মাটিই শুধু নয়, বিদেশেও সক্রিয় ছিলেন অকুতোভয় তরুণরা৷ লন্ডনে ইংরেজ সিভিলিয়ান কার্জন ওয়াইলিকে হত্যা করেন মদনলাল ধিংড়া৷ ১৯০৯ সালে ধিংড়ার ফাঁসি হয়৷
স্বদেশি আন্দোলনে ছাত্ররাই ছিল মূল শক্তি৷ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে উৎসাহ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত ছাত্রদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে শচীন্দ্রপ্রসাদ বসুর নেতৃত্বে কলকাতায় গড়ে ওঠে অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি৷
সব থেকে বড় ঝাঁকুনিটা দেন বাঘা যতীন অর্থাৎ যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়৷ তাঁর অনুগামীরা পরবর্তীকালে ভারতের মুক্তিসংগ্রামের এক-একটি স্তম্ভে পরিণত হন৷ যেমন, রাসবিহারী বসু, মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনী মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ৷বাঘা যতীনই প্রথম ভারত স্বাধীন করতে বিদেশি সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন৷ সেইমতো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসেছিল বঙ্গোপসাগরের কূলে এসেছিল জার্মান যুদ্ধজাহাজ ‘মাভেরিক’৷কিন্তু সময়ের এধার-ওধার হওয়ায় সেই অস্ত্রশস্ত্র বাঘা যতীন ও তাঁর বিপ্লবী বাহিনীর হাতছাড়া হয়ে যায়৷ ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওডিশার বুড়িবালামের মোহনায় বাধে ব্রিটিশ ফৌজের বিরুদ্ধে বাঘা যতীন ও তাঁর অনুগামী মুষ্টিমেয় বিপ্লবীর লড়াই৷সেই অসম যুদ্ধে বাঘের মতো পরাক্রম দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় তাঁদের৷তবু ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও এতটুকু নেভেনি সেই আগুন৷ binay badal dinesh
এই তো গেল অগ্নিযুগের প্রথম অধ্যায়৷ এর পর দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ১৯২৯ সালে৷ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড ভারত৷ পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট সন্ডার্সকে হত্যা, কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তের বোমা নিক্ষেপ৷আন্দোলনের ছত্রে ছত্রে যুব সমাজের ভূমিকা লক্ষ করা যেতে থাকে৷ এর মধ্যেই দীর্ঘদিন জেলের মধ্যে অনশনের ফলে মৃত্যু হয় বিপ্লবী যতীন দাসের৷
এর পর আসে সত্যিকারের অগ্নিযুদ্ধের পালা৷ ১৯৩০ সালে ‘মাস্টারদা’ সূর্য সেনের নেতৃত্বে কিছু দুঃসাহসী তরুণ-তরুণীকে দেখা যায় চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করতে৷ সেই বছরই ঘটে ঐতিহাসিক অলিন্দ যুদ্ধ৷ রাইটার্স বিল্ডিংসে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হামলা বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্তর৷মৃত্যু হয় কারাবিভাগের অধিকর্তা সিম্পসনের৷রাইটার্সেই লড়তে লড়তে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মঘাতী হন বাদল৷বিনয় বসু নিজের কপালে গুলি চালান৷পরে মারা যান হাসপাতালে৷ফাঁসি হয় দীনেশের৷
এভাবেই দফায় দফায় নিজেদের দেশপ্রেম উজাড় করে দিয়েছেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা৷দেশের স্বার্থে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁরা৷তাঁদের সেই লড়াই ব্যর্থ হয়নি৷পরবর্তী সময়ে উত্তাল ’৪২ এবং দাবানলদাহের ’৪৬ প্রমাণ করে দেয়, তাঁদের রক্তঋণ শোধ করতে পরবর্তী প্রজন্ম কত ব্যাকুল ছিল৷