মনকে জানার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হল সাইকলজি

1194

একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণিতে সাইকলজি বিষয়টা পড়োনি, তারাও কিন্তু স্নাতকস্তরে সাইকলজি নিতেই পারো। তবে মনে রাখতে হবে, বিষয়টা সম্পর্কে অনেকেরই একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে। মনে করা হয় সাইকলজি মানে মনোরোগের বিদ্যা। না। বরং মনকে জানবার একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হল সাইকলজি। মনোরোগীদের শুশ্রূষাও এর একটি অঙ্গ নিশ্চয়ই, (যেটা পড়ে ক্লিনিক্যাল সাইকলজি-র মধ্যে) কিন্তু তা ছাড়াও সাইকলজি-র আরও অনেক শাখা। যেমন, সোশ্যাল সাইকলজি, এক্সপেরিমেন্টাল সাইকলজি, ডেভেলপমেন্টাল সাইকলজি, অর্গানাইজেশনাল সাইকলজি, এডুকেশনাল সাইকলজি ইত্যাদি।

এদের মধ্যে সোশ্যাল সাইকলজি, এক্সপেরিমেন্টাল সাইকলজি-তে মূলত বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করা হয়। তবে বাকি শাখাগুলিরও কিন্তু অ্যাপ্লায়েড ভ্যালু রয়েছে। ধরো, ডেভেলপমেন্টাল সাইকলজি-তে বর্তমানে বিশেষ কাজ হচ্ছে ডেভেলপমেন্টাল ডিস-এবিলিটি নিয়ে। সোশ্যাল সাইকলজি-তে মূলত প্রোপ্যাগান্ডা, প্রেজুডিস, স্টিরিওটাইপ, লিডারশিপ ইত্যাদি নিয়ে কাজকর্ম হয়। একটা উদাহরণ দিই। বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। এই নেতৃত্বের পরিবর্তন কেন এল? কী ভাবে এল? যে নেত্রী এখন ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁর মধ্যে কী বৈশিষ্ট্য ছিল যার জন্য জনসাধারণ তাঁকে মনোনীত করল? বা যদি প্রেজুডিস-এর (কুসংস্কার) কথাই ধরি, কেন কুসংস্কার মানুষের মধ্যে জন্ম নেয়, কেন তা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক, কী ভাবে এই কুসংস্থার থেকে মানুষকে মুক্ত করা যায় এই সব নিয়ে কাজ করা যায় সোশ্যাল সাইকলজিতে। আবার এক্সপেরিমেন্টাল সাইকলজি-র (যার আর এক নাম কগনিটিভ সাইকলজি) মধ্যে বেসিক বিষয়গুলি রয়েছে অর্থাৎ সেনসেশন, পারসেপশন, মেমরি, লানিং ইত্যাদি। এই কগনিটিভ সাইকলজির সঙ্গেই এখন জুড়ে গেছে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন (যেমন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স), কম্পিউটার সিমুলেশন ইত্যাদি।

বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। এই নেতৃত্বের পরিবর্তন কেন এল? কী ভাবে এল? যে নেত্রী এখন ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁর মধ্যে কী বৈশিষ্ট্য ছিল যার জন্য জনসাধারণ তাঁকে মনোনীত করল?

গবেষণার জন্য দারুণ ক্ষেত্র! অ্যাপ্লায়েড কগনিটিভ সাইকলজির মধ্যে পড়ে নিউরো-সাইকলজি অর্থাৎ মস্তিস্ক বিষয়ক কাজকর্ম। এই যেমন ব্রেন বিহেভিয়র রিলেশনশিপ। এখানে ব্রেন প্যাথোলজি স্টাডি করার হয় এবং এর সঙ্গে ব্যক্তির ব্যবহারে কোনও পরিবর্তন (বিহেভিয়ারাল চেঞ্জ) হচ্ছে কিনা সেটা দেখা হয়। যদি তা হয় তা হলে তাকে কী ভাবে ‘রিহ্যাবিলিটেট’ করা যাবে সেই সব দিক নিয়ে কাজ হয় নিউরো সাইকলজি-তে। এটা ক্লিনিক্যাল সাইকলজি-র একটা অংশ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

phy-1

ক্লিনিক্যাল সাইকলজি সম্বন্ধে আমরা কম বেশি কিছু না কিছু জানি। সে ভাবে দেখতে গেলে ক্লিনিক্যাল সাইকলজির একটা বড় অংশই রোগীর শুশ্রূষা, তাদের অ্যাসেসমেন্ট, থেরাপি, রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনবার্সন। এ ছাড়াও ক্লিনিক্যাল সাইকলজিস্টরা কাজ করেন অন্যান্য ক্ষেত্র নিয়ে, যেমন বৈবাহিক সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা। এই ধরনের সমস্যা যখন মাত্রাতিরিক্ত নয় তখন যে ধরনের কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন হয়, সেটা ক্লিনিক্যাল সাইকলজিস্টরাই করতে পারেন। এদের বলা হয় ক্লিনিক্যাল কাউন্সেলিং সাইকলজিস্ট। তবে একটা কথা। সাইকলজিতে স্নাতকোত্তর পাশ করলেই কিন্তু ক্লিনিক্যাল সাইকলজিস্ট হওয়া যায় না। ক্লিনিক্যাল সাইকলজিস্ট হিসেবে প্র্যাকটিস করার জন্য ভারত সরকারের রেজিস্ট্রেশন নম্বর চাই। তার জন্য ক্লিনিক্যাল সাইকলজি-র এম ফিল ডিগ্রি লাগে।

গবেষণার জন্য দারুণ ক্ষেত্র! অ্যাপ্লায়েড কগনিটিভ সাইকলজির মধ্যে পড়ে নিউরো-সাইকলজি অর্থাৎ মস্তিস্ক বিষয়ক কাজকর্ম। এই যেমন ব্রেন বিহেভিয়র রিলেশনশিপ।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকলজি-তে দুটো বিভাগ ডিপার্টমেন্ট অব সাইকলজি এবং ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাপ্লায়েড সাইকলজি। রাজ্যের বাইরে ভাল প্রতিষ্ঠানগুলি হল, নিমহান্স বেঙ্গালুরু, রিনপাস রাঁচি, সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব সাইকায়্যাট্রি রাঁচি, দিল্লি ইউনিভার্সিটি, বি আর অম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, পুণে ইউনিভার্সিটি, বরোদা এম এস ইউনিভার্সিটি, গাঁধীনগরের ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সায়েন্সেস, গুরগাঁও-এর ব্রেন রিসার্চ সেন্টার, এলাহাবাদ-এর ইনস্টিটিউট অব কগনিটিভ সায়েন্সেস।

সাইকলজির সঙ্গে অনেক বিষয়ের যোগ। সব থেকে বেশি যোগ বায়োলজিক্যাল সায়েন্স-এর সঙ্গে। তা ছাড়াও আছে ইনফরমেশন-রিলেটেড সায়েন্স, ফিজিক্স, সোশিয়োলজি, ফিজিয়োলজি, অ্যানাটমি, নিউরো-অ্যানাটমির সঙ্গে। আর একটা বিষয় বাদ দিলে চলবে না: স্ট্যাটিসটিক্স। এখন কোয়ান্টিটেটিভ ও কোয়ালিটেটিভ মেথডস্-এর ওপরেও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে সাইকলজি-তে। আবার, সোশিয়োলজি, অ্যানথ্রপোলজি বিষয়দুটির সঙ্গেও সাইকলজির গভীর যোগ।

এখন যে ভাবে সমাজে মনোরোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে সচেতনতা। ফলে চাকরির ক্ষেত্রে স্কুল, বেসরকারি সংস্থা, এন জি ও এবং হাসপাতালে সাইকলজিস্টদের প্রচুর চাহিদা। বিভিন্ন স্কুলে এখন কাউন্সেলরদের নিয়োগ করা হয়। এ ছাড়া বিষয়টি পড়ে আই এ এস, বি সি এস-এর মতো কম্পিটিটিভ পরীক্ষাও দেওয়া যায়।

সব শেষে বলব, যারা মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালবাসে, কথা বলতে ভালবাসে, মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করার মানসিকতা আছে তাদের সাইকলজি নিয়ে পড়া উচিত। মানুষের মন এতটাই বিচিত্র যে এখনও অনেক কিছুই উদ্ঘাটন করা বাকি রয়েছে।

phy-4