স্বপ্নের জগত ছেড়ে ফিরে আসুন বাস্তবের মাটিতে

606

সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে রাহুল৷ ফেসবুকে ফ্রেন্ড লিস্টে বন্ধুদের সংখ্যা ৫০০০। তাঁর একটা পোস্ট মানেই তাতে লাইক এবং কমেন্টের বন্যা৷ সোশাল নেটওয়ার্কে রাহুলের অ্যাক্টিভিটি দেখে ধন্য ধন্য করে তাঁর বন্ধুরা৷ দেশ,বিদেশের প্রায়ই সব খবরই রাখে রাহুল৷ শুধু খবর রাখাই নয় প্রতিটি ঘটনা নিয়ে তাঁর নিজেস্ব মতামত আছে৷ যা সোশাল নেটওয়ার্কে বরিষ্ঠ যুক্তির মাধ্যমে সে পোস্ট করে৷ এমন সোশাল নেটওয়ার্কের পোকা রাহুল হঠাৎ নেট দুনিয়া থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে নিল৷ কিন্তু কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর ভাবিয়ে তুলেছে রাহুলের বন্ধুদের৷ দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ থেক ১৭ ঘণ্টা যাঁকে ইন্টারনেটে মুখ খুঁজে থাকতে দেখা যেত সে হঠাৎ নেট দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেল কেন? রাহুলকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেও সে প্রসঙ্গ এরিয়ে যায়৷ কিন্তু কেন?

প্রতিবেদন: তারক ভট্টাচার্য
প্রতিবেদন: তারক ভট্টাচার্য

জাম্প কাট টু রাহুলের বেডরুম

(মাস দুয়েক আগের একটি রাত)

ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটে৷ রাহুল তখনও ঘুমোতে যায়নি৷ নিজের বিছানায় ল্যাপটপে মুখ খুঁজে একজনের প্রোফাইল অ্যালবাম দেখছে সে৷ মেয়েটিকে সে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না৷ অনলাইনেই আলাপ৷ এক সপ্তাহ যাবৎ নিয়মিত দু’জনের চ্যাটও চলছে৷ কখন সে অনলাইন হবে? সেই চিন্তায় সব সময় এখন মাথায় ঘোরে রাহুলের৷ অনলাইনে প্রেমে রাহুল বিশ্বাসী নয়৷ কিন্তু এই মেয়েটির মুখেই রয়েছে এক সারল্য এবং মিষ্টতার ছাপ৷ প্রেম নয়,তবে এই মেয়েটিকে কাছ থেকে দেখাই যেন তার জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ইদানিং৷ এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার দেখা করার জন্য সে বলেছে মেয়েটিকে৷

জাম্প কাট টু সিসিডি

(১ সপ্তাহ পর…)

আজ সে আসছে৷ প্রস্তুতির শেষ নেই রাহুলের৷ ওয়ার্ডরোবের সব থেকে প্রিয় পোশাকটাই আজ পড়েছে রাহুল৷ সিসিডি-তে দেখা করার কথা৷ নির্ধারিত সময়ের আধ ঘণ্টা আগে সে পৌঁছে গিয়েছে৷ এতদিন ভালো লাগার সেই মুখটাকে এবার চাক্ষুষ করতে চলেছে সে৷ পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগে যেভাবে পেটে মোচড় দেয় ঠিক তেমনই অনুভূতি আজ হচ্ছে রাহুলের৷ কীভাবে সে কথা শুরু করবে? তা নিয়েও আয়নার সামনে একপ্রস্থ রিহার্সাল দেওয়া হয়ে গিয়েছে রাহুলের৷

facebook-5

(মিনিট ২০ পর…)

রাহুলের সামনে এসে সে বসল৷ সেই মেয়েটি কি? হ্যাঁ এ যে সেই মেয়ে৷ রাহুলের মনে হল তাঁর গালে যেন সপাটে কেউ চড় কষিয়ে দিয়েছে৷ এ যে সেই মেয়ে তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই৷ তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ফেসবুকে প্রোফাইল অ্যালবামে এই মেয়েকে দেখেই যে তাঁর হৃদয়ে পিয়ানোর সুর বেজেছিল৷ কিন্তু মুখ এক হলেও সেই ছবির সঙ্গে যেন আকাশ পাতাল তফাত৷ প্রযুক্তির কি মহিমা! সেদিন বেশিক্ষণ মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে পারেনি সে৷বিমর্ষ রাহুল কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে৷ এক কালের নেট স্যাভি রাহুল নিজের সমস্ত সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিয়েছে৷

রাহুলের মতো অভিজ্ঞতা যাঁদের সঙ্গে ঘটেছে তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে Campus এই গল্পের মাধ্যমে ঠিক কী বলতে চাইছে? ফেক প্রোফাইল, ওভার এডিটেড ছবি, শরীরের ‘সম্পদ’কে বেশি করে এক্সপোজ করা৷ সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এই ধরনের স্টান্টবাজি করে আপনি হয়ত অনেক লাইক এবং কমেন্ট পাবেন৷ বন্ধুমহলে প্রচুর প্রশংসা পাবেন৷ রাহুলের মতোই অনলাইনে আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে হা হিত্যেশ করবে কেউ কেউ৷ কিন্তু একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন আপনি কি সত্যিই তাই? যাঁকে কিংবা যাঁদের ইমপ্রেস করার জন্য আপনি সোশাল নেটওয়ার্কে নানা কর্মকাণ্ড করছেন, সে বা তাঁরাই যখন আপনাকে সশরীরে দেখবে, তখন? আপনি বাস্তবে যেমনই হোন না কেন, আপনাকে সোশাল নেটওয়ার্কে ক্যাটরিনা হতে হবে এমন মাথার দিব্যি আপনাকে কে দিয়েছে? আপনার ‘ওভার এডিটেড’ ছবিগুলো দেখে যাঁরা আপনার সম্পর্কে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন, একবারও ভেবে দেখেছেন তাঁরা আপনাকে চিনতে আগ্রহী নাকি বেশি আগ্রহী আপনার ছবিকে নিয়ে৷কিন্তু আপনি তো জানেন যে এই ছবির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছেন আপনি৷ আপনার ব্যক্তিত্ব৷ সেটাই তো আপনি৷ তাঁকে কেউ চিনতে আদতেও চায় কিনা?

facebook

আমি যেমনই হই না কেন, আমি আমিই৷ এই মন্ত্রটাকে একবার নিজের জীবনের মন্ত্র বানিয়ে দেখুন৷ তাতে সোশাল নেটওয়ার্কের ফ্রেন্ডলিস্টে সংখ্যা কমে যেতে পারে, আপনার ছবিতে লাইক এবং কমেন্টও কমে যেতে পারে৷ কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত হবেন, যে যাঁরা ওই লাইক এবং কমেন্ট করছেন৷ তাঁরা আপনার সম্পর্কে আগ্রহী আপনার সেই সব কালার কারেকশন করা ছবি সম্পর্কে নয়৷

শুধু তাই নয় ভারচুয়াল এই ওয়ার্ল্ডের সম্মোহনের হাত থেকে নিজেকে মাঝেমধ্যে একটু অবসর দিন৷ আপনার অনেক বন্ধুরা অনেকেই হয়তো দেখবেন উঠতে বসতে স্ট্যাটাস আপডেট করছেন৷ সেখানে ‘আমি আজ ডাল দিয়ে ভাত খেয়েছি৷’ এই ধরণের স্ট্যাটাসেরও অভাব নেই৷ একটা বিষয় মনে রাখবেন আপনার বন্ধুর এই ধরণের স্টাটাস যেভাবে আপনার হাসির উদ্রেগ করে৷ ঠিক সেইভাবেই অন্যের কাছেও সে হাস্যস্পদ হয়৷ বন্ধুকে পারলে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখবেন তো, যে সে কবে হাতের সেলফোনটাকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রথম বর্ষার বৃষ্টিতে দু-হাত ছড়িয়ে ভিজেছে কিংবা কবে এক মনে কোনও উপন্যাসের পাতা উলটেছে? ইন্টারনেটের নেশার জাল কেটে বেরোতে পারলে তবে তো জীবনের এই সব রঙরসকে সে উপভোগ করতে পারবে৷ আদতে আমরা যতবেশি প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছি, ততবেশি ‘মেটারিয়ালিস্টিক’ (ইংরেজি শব্দ এক্ষেত্রে বেশি অর্থবহ) হয়ে উঠছি৷নিজেকে ভুলে যাচ্ছি৷ ইন্টারনেটের জালে জড়িয়ে পড়ছি৷ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিন্সের একটি আশংকার কথা এক্ষেত্রে মনে পড়ে যাচ্ছে, মানুষ যেভাবে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে মানুষ যন্ত্রের দাস হয়ে যেতে পারে৷ আপনার অত্যাধিক পরিমাণ ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে বিচরণ সেই দাসত্বের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ৷

Campus -এর আরও কভার স্টোরি পড়তে হলে-

কালো ঘোমটা সরিয়ে এখন হাতের মুঠোয় ফোটোগ্রাফি

ভারতীয় সেনার ঈর্ষণীয় নয়টি কমান্ডো বাহিনী

রাজনীতিতে বন্ধু

বিটনুন আর চুরমুরের গল্প বল, বন্ধু চল

আকাশেও এখন অজেয় ভারতীয় বিমানবাহিনী