সিনেমাই যখন হল ‘নাটকের মতো’

595

প্রথমেই বলে নিই কেয়া চক্রবর্তী অভিনীত নাটক  জ্ঞানত আমি দেখিনি ৷ জ্ঞানত বললাম এই কারণে ১৯৭৭ সালে যখন এই নাট্যবক্তিত্বের মৃত্যু হয় তখন আমি নেহাত শিশু-  স্কুলে ক্লাস টুয়ে পড়তাম৷ ফলে বাড়ির লোকের সঙ্গে তাঁর অভিনীত দুটি নাটক দেখতে গেলেও তা সত্যিই আমার স্মৃতিতে নেই ৷ তবে এটা মনে আছে তাঁর মৃত্যুটা অস্বাভাবিক হওয়ায় বাড়িতে কিছুদিন তা নিয়ে আলোচনা হত ৷ আর একটা বিষয় হল এই কেবল টিভির যুগে এখন আমরা রেডিও শোনা ভুলতে বসেছি ৷ কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় টিভি এলেও তার এমন দাপট ছিল না, ফলে রেডিওতে তখন যে নাটক শোনান হত তা বেশ জনপ্রিয় ছিল৷ এ রকম রেডিও নাটকে মাঝে মাঝে কেয়া চক্রবর্তীর গলা শুনেছি ৷ এটা ঠিক আমরা যে কেউ জন্মের আগের হওয়া সিনেমাগুলি দেখার সুযোগ পাই কারণ সাধারণত সিনেমা সংরক্ষণের একটা ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু আমাদের শৈশবের অথবা জন্মের আগে মঞ্চে অভিনীত নাটক দেখা সম্ভব হয় না সংরক্ষণের অভাবে৷ ফলে আমার মতো অভাগার শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেয়া চক্রবর্তীর মতো অভিনেতা অভিনেত্রীদের নাটক-অভিনয় দেখার সুযোগ হয়নি কারণ মাধ্যমিকে পাশের পর মানে ১৯৮৬ সাল থেকে নিয়মিত আমি নাটক দেখছি৷ সেদিক থেকে বলব কেয়া চক্রবর্তীর জীবনের আদলে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘নাটকের মতো’ অবশ্যই একটা খুব ভাল উদ্যোগ৷ দেবেশকে মূলত নাটকের মানুষ বলেই জানি৷ ওর মধ্যেও নাটক সংরক্ষণের অনুভূতিও রয়েছে তাই বোধহয় খুঁজে নিতে চেয়েছে বাংলা নাটকের ইতিহাসের একটা অধ্যায়কে ৷ ‘নাটকের মতো’ ছবিতে তো ধরা হয়েছে একটা সময় কালকেও ৷ কেয়ার আদলে খেয়া হওয়ায় এটাকে পুরোপুরি বায়োপিক না বললেও অনেকটাই বায়েপিক৷ তাছাড়া এই ছবিতে তো ষাট- সত্তরের দশকটা আরও একবার ফিরে দেখার প্রয়াস৷

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

‘নাটকের মতো’য় খেয়া চক্রবর্তীর বাঁচা এবং মরার আখ্যান৷ আপসহীন খেয়া নাটক আর অভিনয় নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল৷ তাই কলেজের চাকরি ছেড়ে ছিল নাটককে ভালবেসে৷ নাটকের জন্য নিজের সমস্ত সোনা বাঁধা দিতে দ্বিধা করেননি৷ আবার নাটক করতে করতে বেঁচে থাকতে টাকার জন্য সিনেমায় অভিনয় করতে বাধ্য হন আর শুটিংয়ের সময় গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে গিয়ে সলিল সমাধি৷ প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর এই মৃত্যু ঘিরে, যা আজও এক রহস্য- আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা বলে৷  টালমাটাল ৬০ আর অশান্ত ৭০ দশকের খেয়া এখানে কেয়ার মতোই  প্রতিবাদী তাই কোনও ছাত্রকে যখন একদল ছাত্ররূপী গুন্ডা মারধোর করে সে একাই সাহস করে এগিয়ে যায় অসহায়কে বাঁচাতে৷ সিনেমা নামই যেখানে ‘নাটকের মতো’ তাই কোলাজের মতো মাঝে মাঝে এসে গিয়েছে খেয়া অভিনীত ‘শের আফগান’, ‘ভালো মানুষ’, ‘আন্তিগোনে’ নাটকের কিছু  দৃশ্য৷ এই ছবি দেখতে গিয়ে কারও কারও বা  ঋত্বিক ঘটকের কোমলগান্ধারের কথা মনে পড়তে পারে, এখানেও তো রয়েছে নাটকের দল ভাঙার কাহানি৷ খেয়ার মৃত্যুর পর তাঁদের নাটকের  দল ‘নটকার’ ভেঙেছে৷ ছবিতে রয়েছে ‘নটকার’ দলে দুই নাট্য ব্যক্তিত্বে প্রসাদ আর অমিতেশের ইগোর লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে কেমন অবস্থা হয়েছিল খেয়ার ৷ এই প্রসাদ আর অমিতেশই মধ্যেই তো সেই সময়ের যথাক্রমে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে খোঁজার চেষ্টা চলেছে? আর কেয়ার মৃত্যুর পরই তো নান্দীকার ভেঙেছিল৷ দেবেশ এখানে  নাটককে ভিত্তি করে সিনেমা আর সিনেমার মধ্যেই নাটককে এনে মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়ে একটা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছেন৷

সঙ্গে পড়ুন- স্মৃতির খেয়ায় কেয়া কাহিনি

এই ছবিতে রয়েছে এক বিশেষ চরিত্র  পুলিশ ইন্সপেক্টর ভবদুলাল যে খেয়ার মৃত্যুর তদন্ত করতে নেমে একের পর এক খেয়ার পরিচিত মানুষগুলোর সংস্পর্শে এসেছে ৷ তদন্ত চালাতে গিয়ে উন্মোচিত হতে থাকে খেয়ার জীবনের নানা দিক ৷ মা অনন্যার সঙ্গে মেয়ের সম্পর্ক কিংবা সেই মহিলার স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা৷ উঠে এসেছে অধ্যাপক পরে সহকর্মী মনোরঞ্জনবাবু চোখে খেয়া এবং  কলেজ জীবনের কিছু ঘটনা৷ আন্তঃকলেজ নাট্য প্রতিযোগিতায় বিচারক হয়ে আসা অমিতেশের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, কিংবা প্রসাদের সঙ্গে খেয়ার বন্ধুত্ব তথা প্রেম৷ তদন্তকারী পুলিশের এদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জেনেছেন খেয়ার রাজনৈতিক বাম মনোভাবের কথা৷ তা জানতে তিনি বুঝে নিতে চেয়েছেন মানসিকতা- শুধুই বাম নাকি অতি বামের তফাৎটাও৷ ছবিতে এই পুলিশ ইন্সপেক্টর যেন এক নিছক তদন্তকারী থাকেন না, ধীরে ধীরে পরিণত হন নাট্যপ্রেমী এক দর্শকে ৷ এই চরিত্রটিতে সত্যিই খুব ভাল লেগেছে রজতাভ দত্তকে৷ আগেই বলেছি কেয়া চক্রবর্তীর অভিনয় দেখিনি তাই বলা সম্ভব নয় খেয়া রূপী পাউলি দাম কতটা সত্যিই কেয়া হয়ে উঠতে পেরেছেন৷ তবু বলল তাঁর মধ্য দিয়ে কেয়াকে চেনার চেষ্টা নিশ্চয় করবে এই প্রজন্মের দর্শকরা ৷ ছবিতে প্রসাদের ভূমিকায়  শ্বাশত চট্টোপাধ্যায়ের এবং অমিতেশের ভূমিকায় ব্রাত্য বসু মানানসই ৷ তবে একেবারে এঁদের মধ্যে দিয়ে রুদ্রপ্রসাদ অথবা অজিতেশকে খোঁজা বোধ হয় উচিত হবে না৷ মায়ের চরিত্রে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং মনোরঞ্জনবাবুর ভূমিকায় নীল মুখোপাধ্যায় খুবই স্বাভাবিক এবং বাস্তব৷