বিশ্বায়নের সিড়ি ভাঙায় চরিত্র বদল মুঠোফোনের

627
pic
-সৌমেন শীল

ভারতের মাটিতে এক বঙ্গতনয় আবিষ্কার করেছিলেন বেতার। যদিও মোবাইল ফোন তাঁর মস্তিষ্ক প্রসূত ছিল না। জগদীশবাবু নিজে মোবাইল ফোন সম্পর্কে কোনও ভবিষ্যতবাণী করে গিয়েছিলেন কিনা সেটিও জানা যায় না। ২০১৬ সালের জিও সিম নিয়ে আলোড়নের বিন্দুমাত্রও তিনি আঁচ করতে পারেননি কখনও। কারণ ভারতে মোবাইলের যাত্রা শুরু হয় তাঁর প্রয়াণের অনেক পরে। ভারতে মোবাইল ফোনের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক বাঙালির মাধ্যমেই। শুধু তাই নয় বাঙালির প্রাণের শহর কলকাতা থেকেই হয়েছিল দেশের প্রথম মোবাইল কল। ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই কলকাতা থেকে সেই ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। মহাকরণ থেকে সেদিন জ্যোতিবাবু ফোন করেছিলেন দিল্লির সঞ্চার ভবনে থাকা দেশের টেলিকম মন্ত্রী সুখ রামকে। অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত টেলিকম সংস্থা মোদী গোষ্ঠীর টেলস্ট্রা মোবাইল নেট পরিষেবা ব্যবহৃত হয়েছিল মহান ভারতের প্রথম মোবাইল কলে।

যদিও সূচনা লগ্নে বিশেষ পসার জমাতে পারেনি মুঠোফোন। একবিংশ শতকের প্রথম দিকে সস্তা হতে শুরু করে মোবাইল ফোন। সেইসঙ্গে হাজির হয় মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী একাধিক সংস্থা। বিএসএনএলের সঙ্গে হাচ, এয়ারটেল এবং রিলায়েন্সের মধ্যে শুরু হয়েছিল প্রতিযোগিতা। জিএসএম মোবাইলের সঙ্গে সিম কার্ড নিয়ে মোবাইল চালু করতে হতে প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি খরচ করতে হতো। অন্যদিকে সিডিএমএ রিলায়েন্সের অনেক কম দামের সেট ছিল। সেইসময় মোবাইলে ইনকামিং ব্যবস্থা চালু রাখার জন্যেও নূন্যতম সাত-আট টাকা ব্যালেন্স রাখা ছিল বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে সারা মাস মোবাইল ব্যবস্থা চালু রাখতেও নূন্যতম খরচ করতে হতো। অর্থাৎ মোবাইল পরিষেবার বৈধতা বজায় রাখার জন্যেও মাসুল গুনতে হতো।

রিলায়েন্সের ঢঙে সিডিএমএ মোবাইল পরিষেবা নিয়ে ২০০৫ সালের গড়ার দিকে বাজারে এল টাটা। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে চালু হল নানারকম স্কীম। কম খরচে দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য নানান স্কীম নিয়ে আসতে শুরু করল সংস্থাগুলি। সেই সঙ্গে অনেক সংস্থার মূলধন ছিল ভালো নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। এসবের মাঝে টেলিকম দুনিয়ায় চমক দিয়ে নতুন কানেকশন নিলেই বিনামূল্যে দু’বছরের বৈধতা দেওয়া শুরু করল টাটা ইন্ডিকম। সেইসময় থেকে শুরু হল বৈধতা নিয়ে প্রতিযোগিতার লড়াই। দিন কয়েকের মধ্যেই সেই রকমই কিছু পরিষেবা চালু করেছিল রিলায়েন্স। এসব কিছুকেই চমকে দিয়ে সারা জীবনের বৈধতার প্যাকেজ চালু করল এয়ারটেল। এর জন্য গ্রাহকদের এককালীন ৯৯৯টাকার রিচার্জ করতে হতো। রাতারাতি একই স্কীম চালু করল হাচ। সব সংস্থাই তখন সারা জীবন বৈধতা দেওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করল। তবে সারা জীবনের বৈধতা ধারী গ্রাহকদের কল রেট অনেক বেশি ছিল। সব ধরনের গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে মাসিক ৯৯টাকা রিচার্জের মাধ্যমে সারা জীবনের বৈধতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করল এয়ারটেল। সেক্ষেত্রে গ্রাহকদের টানা একবছর প্রতি মাসে ৯৯টাকা কর রিচার্জ করতে হতো।

২০০৬ সালের গোড়ার দিক থেকে প্রায় দেড় বছর চলেছিল এই সারা জীবন বৈধতার লড়াই। ২০০৭ সালেই নতুন কানেকশনের সঙ্গে দু’হাজার মিনিট ফ্রি টকটাইম দেওয়া শুরু করেছিল রিলায়েন্স। ইতিমধ্যেই রিলায়েন্স সিডিএমএ পরিষেবার সঙ্গে জিএসএম পরিষেবাও চালু করেছে রিলায়েন্স। নাম দিয়েছে রিলায়েন্স স্মার্ট। সেইসময় বাংলায় না এলেও অন্য অনেক রাজ্যে টেলিকমের পসরা নিয়ে হাজির হয়েছে এয়ারসেল। ২০০৮ সালে বাংলার মাটিতে পা রেখেছিল এয়ারসেল। ২০০৭ সালে হাচ বদলে হয়ে যায় ভোডাফোন। সেইসময় কম খরচে মোবাইলের মাধ্যমে মনের ভাব বোঝানোর জন্য বেশ উপযোগী ছিল এসএমএস। সেইসঙ্গে বন্ধু বা পরিচিতদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেও খুবই উপযোগী ছিল এসএমএস। এই সময়েই আবার ফ্রি কলের অফার দিচ্ছিল অনেক সংস্থা। সেইসময় ভারতের বাজারে এসেছিল আরও দু’টি মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ইউনিনর এবং আইডিয়া। একইসঙ্গে টাটা চালু করেছিল জিএসএম মোবাইল পরিষেবা। বাজার ধরতে দিনে ৯৮টি করে এসএমএস ফ্রি দিচ্ছিল টাটার জিএসএম সার্ভিস ডোকোমো। এখনও অনেক ডোকোমো নম্বরে সেই পরিষেবা চালু রয়েছে। সেইসময়েই চালু হলো নতুন স্কীম। মিনিটের জায়গায় সেকেন্ডে কল নিয়ে নতুন স্কীম আনল এয়ারসেল। পরে সব সংস্থায় সেই পথে হেঁটেছিল। হরেক রকমের স্কীম নিয়ে ইউনিনর এলেও আইনের গেরোয় উঠে যায় সেই সংস্থা।

এরই মধ্যে ভারতের বাজারে আসতে শুরু করল ইন্টারনেট পরিষেবা। ডেটা রিচার্জ তখন সবে শুরু হয়েছে। তবে তা খুব একটা প্রসার লাভ করেনি। ২০০৯ সালের শেষের দিকে কিনবা ২০১০ সালের শুরুর দিকে ডেটা রিচার্জ ছিল অনেকটা বিলাসিতার সমতুল। তখনও ভারতের বাজারে সেভাবে বিস্তার লাভ করেনি ফেসবুক। তবে অরকুটে মগ্ন ছিল ভারতবাসী। পরিসংখ্যান অনুসারে ২০১০ সালের প্রথমদিকে বিশ্বের মট অরকুট ব্যবহারকারীর শতকরা ৪০ভাগ ছিল ভারতীয়। ফেসবুক পসার জমাতেই মোবাইলে ডেটা রিচার্জ বৃদ্ধি পেল। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমে গেল এসএমএস রিচার্জ। এরপর এসএমএসের বিকল্প হিসেবে হাজির হল হোয়াটস অ্যাপ। ডেটা রিচার্জ নিয়েই এরপর থেকে শুরু হয়েছে সংস্থাগুলির প্রতিযোগিতা। এই পথেই বিপ্লব নিয়ে এসেছে রিলায়েন্স জিও।