ইচ্ছুক জমিদাতা আসলে সোনার পাথরবাটি

587
b-roy
-বিজয় রায়

৩১ আগস্ট ৷ সিঙ্গুর মামলায় যুগান্তকারী রায় শীর্ষ আদালতের৷ কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হবে জমি ৷ সিঙ্গুর ছেড়ে দিতে হবে টাটা গোষ্ঠীকে৷ ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুক নয় ৷ সকল জমিদাতাদেরই ফেরাতে হবে জমি৷ টাটার কাছ থেকে জমির বিনিময়ে যে কৃষকরা টাকা নিয়েছেন তাঁদের সে টাকা ফেরাতে হবে না৷ আর যাঁরা টাকা নেননি, তাঁদের দিতে হবে ক্ষতিপূরণ ৷ এর পরেই আনন্দে ফেটে পড়ে গোটা সিঙ্গুর ৷ কেউ শাঁখ বাজিয়ে কেউ উলুধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানায় সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ৷ রাজ্যের বর্তমান শাসক দল সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে রীতিমতো তুলধনা করেছে তৎকালীন বাম সরকারকে ৷ কারণ ? মামলার রায়ে এক বিচারপতির (কারণ প্রথমে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে মত আলাদা ছিল দুই বিচারপতির) পর্যবেক্ষণ, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সঠিক ছিল না ৷ জেলাশাসক থেকে শুরু করে প্রশাসনের উপরমহল সকলের কাজেই ছিল একাধিক কারচুপি৷
৩১ আগস্টের আগে সিঙ্গুর নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলতেন ৷ রাজনীতিক থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী ৷ সাধারণ কৃষক থেকে চায়ের দোকানে ঝড় তোলা বাঙালি আড্ডাবাজ৷ এমনকী সকালে বাজার করতে গিয়ে রামবাবু-শ্যামবাবু বা যদু-মধুরা৷ কেউ পক্ষে কেউ বিপক্ষে ৷ কিন্তু ৩১ আগস্টের পর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আর কোনও দ্বিমত নেই ৷ সকলের এখন একটাই মত, সেদিনের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ভুল ছিল ৷ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে কৃষকের জমি কেড়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন সিপিএম-পরিচালিত বামফ্রন্ট সরকার৷ নেপথ্যে ছিল মূলত তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী নিরুপম (খোকন) সেনের উসকানি৷ যার পরিণাম দীর্ঘ ৩৪ বছরের অচলায়তনের পতন৷ অন্যদিকে ধূমকেতুর মতো বাড়বাড়ন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের৷ এখন এটাও শোনা যাচ্ছে, আগামী দিনে স্কুলের পড়ুয়াদের পাঠ্যসূচিতে আসতে চলেছে এই বিষয়টি ৷ কারণ, রায় ‘ঐতিহাসিক’ ৷
ছাত্র-রাজনীতি থেকেই বাম সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জারি রেখেছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ধর্ষিতা মূক-বধির কিশোরীকে নিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংসে বিচার চাইতে গিয়ে সহ্য করেছিলেন অসহ্য লাঞ্ছনা৷ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর নির্দেশে পুলিশ তাঁর চুলের মুঠি ধরে, লাথি মেরে, টেনেহিঁচড়ে বের করে দিয়েছিল৷ সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন যেসব সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী তাঁদেরও পুলিশ ছাড়েনি৷ পুলিশের লাঠির ঘায়ে ভেঙেছিল একাধিক আলোকচিত্রী-সাংবাদিকের ক্যামেরার লেন্স৷ যুবনেত্রী হিসাবে তাঁর লড়াইয়ের রক্তাক্ত সাক্ষর ছিল একুশে জুলাই ৷ একের পর এক ঘটনায় জ্যোতি বসু থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-অনিল বিশ্বাসদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন ‘অগ্নিকন্যা’৷ ব্রিগেডে বামফ্রন্টের মৃত্যুঘণ্টা কিংবা কেশপুর, সবেতেই তিনি ছিলেন ডোন্ট কেয়ার৷ কিন্তু জনতার রায়ে এগিয়ে থেকেও বুথওয়ারি বৈজ্ঞানিক রিগিংয়ের সামনে তাঁকে হারতে হচ্ছিল বারংবার৷ সিঙ্গুর এল নতুন বার্তা নিয়ে৷ ‘হাল না ছাড়া নেত্রী’ শহর ছাড়িয়ে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেলেন জমি আন্দোলনকে হাতিয়ার করে৷ ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আশ্চর্য ভরাডুবির পর হাতে গরম ইস্যু হয়ে এসেছে সিঙ্গুরের কৃষিজমি দখল করার সরকারি প্রয়াস৷ যে বামপন্থীরা একসময় ‘লাঙল যার, জমি তার’ স্লোগানের মধ্যে দিয়ে গ্রামের জমি না-থাকা গরিব মানুষের হাতে জমি তুলে দিয়েছিল, ক্ষমতায় বেশ কিছু দিন কাটানোর পর বহুকালই তারা জোতদার, ধনী কৃষক আর আড়তদারদের প্রতিনিধি৷ কিন্তু শহুরে চোখে সেটা ধরা পড়ত না৷ সিঙ্গুর ইস্যু শহরেও প্রশ্ন তুলে দিল৷ এক শিল্পপতির হয়ে জমির ‘দালালি’ করছে বাম সরকার? পুলিশ দিয়ে হত্যা করছে গ্রামের কৃষকদের! প্রথমে সিঙ্গুর, অতঃপর নন্দীগ্রাম৷ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ‘কৃষকদরদি, জনদরদি’ সরকারের এই ভূমিকা মেনে নিতে পারলেন না অনেকেই ৷ শুরু হল অভ্যুত্থান৷ ইভিএমে৷ এর মধ্যে অবশ্য যে কোনও দলের জন্যই বৈজ্ঞানিক রিগিংয়ের রাস্তাটা বন্ধ করার যাবতীয় বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন ইলেকশন কমিশনের দুই বাঘা আমলা৷ আমানুল্লা এবং কুরেশি ৷ তার পরের গল্পটা কারও অজানা নয়৷ সিংহাসন থেকে নেমে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের এক চিলতে ঘরে ঠাঁই হল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ৷ স্তালিনীয়, মাওবাদী পন্থার কমিউনিস্ট কুলে যে রকম হয়৷ তাঁর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না৷ সব কিছুর জন্য এখন তিনিই একমাত্র ভিলেন৷ তাঁর নিজের দলেও৷ বাকিরা ধোয়া তুলসীপাতা! মাঝখান থেকে ক্ষমতা হারাতে হারাতে বামেরা এখন এ রাজ্যে ‘থার্ড বয়’ ৷ ২০১৬-র নিরিখে কয়েকজন বাম বিধায়ক পাস করলেও তা টেনেটুনে৷ বরং মাঝখান থেকে ‘সাপ-নেউল জোটে’ নাই মামার থেকে কানা মামা ভালো গোছের ফায়দা তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস ৷ একসময় এ রাজ্য থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা শতাব্দীপ্রাচীন দল এখন ভোটপ্রাপ্তির নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে৷
ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে তৃণমূল নেত্রী বার বার বলেছেন, জোর করে কোনও কৃষিজমি তিনি নেবেন না৷ ক্ষমতায় এসে শিল্পের জন্য আলাদা একটি ল্যান্ড ব্যাংকও তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি ৷ যিনি বিনিয়োগ করতে আসবেন, তাঁকে শুধুমাত্র সেই ল্যান্ড ব্যাংক থেকেই জমি বেছে নিতে হবে৷ এখন প্রশ্ন হল, যিনি বিনিয়োগ করবেন তিনি রাজ্যের স্বার্থ আগে দেখবেন, না নিজের কারবারের ? বিনিয়োগকারীরা কখনও কোনও একটি রাজ্যের স্বার্থ দেখে বিনিয়োগ করেছে বলে শোনা যায় না ৷ কারণ তিনি সেখানেই বিনিয়োগ করবেন, যেখানে কম ব্যয়ে অধিক মুনাফা কামাতে পারবেন৷ তাহলে তিনি নিজে জমি পছন্দ করবেন, না সরকারের ইচ্ছায় জমি নেবেন?
এবার আসা যাক আরও একটি বিষয়ে৷ আর সেটি হল জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া ৷ শীর্ষ আদালত বলেছে, সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া ভুল ছিল ৷ সত্যিই তাই ৷ আর এই বিষয়ে যে কারও দ্বিমত নেই তা আগেই বলা হয়েছে ৷ নতুন করে তা নিয়ে বলার কোনও মানেও হয় না৷ তবে ভুলটা কেন সেটা একবার ভেবে দেখা দরকার ৷ আসলে, ইচ্ছুক জমিদাতা ব্যপারটাই অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতো ৷ কারণ ভারতের মতো একাধারে কৃষিপ্রধান এবং গণতান্ত্রিক দেশে জমি তো আর ‘হরির লুটের বাতাসা’ বা কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দানের প্রসাদ নয় যে, কপালে তিলক মেখে, হরিনাম গাইতে গাইতে বিলিয়ে দেওয়া যাবে ৷ ক্ষমতার দম্ভে যেমনটা করবেন বলে ভেবেছিলেন বুদ্ধদেববাবু-নিরুপমবাবুরা৷ এদেশে একটা প্রক্রিয়াই কার্যকর হতে পারে৷ আর সেটা হল গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নরেন্দ্র মোদীর গৃহীত পন্থা৷ যে কোনও শিল্পপতি-বিনিয়োগকারীর জন্য তাঁর ছিল একটাই কথা৷ আপনারা নিজেরা জমি দেখুন, পছন্দ করুন, যাঁদের জমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন, রফা করুন৷ তার পর সরকার আপনাদের শিল্প গড়তে যাতে অসুবিধা না হয়, সেটা দেখবে৷ বুদ্ধদেববাবুরা যা করেছিলেন সেটা নরেন্দ্র মোদীর পন্থার একেবারেই উলটো৷ তাঁরাই হয়ে গিয়েছিলেন টাটাদের একলাখি গাড়ি কারখানার জন্য জমির দালাল! এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শিল্পের জমির ম্যাপ ও ব্যাংক বানিয়ে দাবি করছেন, বিনিয়োগকারীদের ওখান থেকেই জমি নিতে হবে৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভজনাকারী কতিপয় ৪২০-মার্কা বেওসায়ির কথা বাদ দিলে সতিকারের বিনিয়োগকারী ও উদ্যোগপতিদের কজন তা মানবেন সেটাই আসল প্রশ্ন৷
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বর্ধমান ও পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে শুরু হয়ে গিয়েছে নয়া জটিলতা ৷ হয় কারখানা কর, না হলে ফিরিয়ে দাও জমি ৷ চাষ হোক বা না হোক, আমার জমি অন্তত আমারই থাকুক৷ আর এই পরিস্থিতিতে আদৌ কজন উদ্যোগপতি এ রাজ্যে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ দেখাবেন তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায় ৷
গায়ের জোরে কৃষিজমি নিয়ে বেসরকারি শিল্প গড়ার চেষ্টা করলে আগামী দিনে জনকল্যাণমুখী কোনও কাজেও যে আর জমি পাওয়া যাবে না, সে ব্যাপারে প্রথম সতর্ক করেছিলেন সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখনও কিন্তু সিঙ্গুরে আন্দোলনে নামেননি৷ সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত ছাড়া বুদ্ধদেববাবুদের এহেন কার্যকলাপের বিরোধিতা সেদিন যিনি করেছিলেন তাঁর নাম রেজ্জাক মোল্লা৷ তখন তিনি বুদ্ধদেববাবুর মন্ত্রিসভারই সদস্য৷ ভূমি ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রী৷
সিপিএমের লোকেরা তখন প্রচার করত, বরুণ সেনগুপ্ত আসলে বিড়লা-গোয়েঙ্কাদের পয়সা খেয়ে সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানা করতে দিতে চান না৷ কিন্তু গায়ের জোরে উর্বর কৃষিজমি নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি যে সেদিন একটি কথাও ভুল বলেননি সুপ্রিম কোর্টের রায়েই তা প্রমাণ হয়ে গেল৷
এই অবস্থায় রাজ্য জুড়ে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে নতুন করে যে হল্লা শুরু হয়েছে তাতে কিন্তু অনেকেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে পাচ্ছেন৷ বিক্ষোভের এই আগুন যদি এখনই ঠান্ডামাথায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে নেভানো না যায়, তাহলে আগামী দিনে ১০টা কেন ১০ হাজার শিল্প সম্মেলন করেও কানাকড়ি আনতে পারবেন না মুখ্যমন্ত্রী ৷