‘পিঙ্কে’র উপলব্ধি কমবয়সীদের সম্পর্ককে আরও স্বাভাবিক করবে

1095

‘পিঙ্ক’ ছবিতে একটি মেয়ে আত্মরক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে বোতল দিয়ে আঘাত করেছে একটি ছেলেকে৷ কিন্তু আঘাত না করলে ওই মেয়েটিকে হয়তো রেপড হতে হত৷ কিন্তু ছেলেটি তো বড়লোক ও প্রভাবশালী রাজনীতিকের ‘ভাতিজা’৷ ফলে যথারীতি পুলিশ-প্রশাসনে কলকাঠি নেড়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল এই অভিযোগে মেয়েটিকে গ্রেফতার করানো হয়৷ তার আগেই মেয়েটি পুলিশ স্টেশনে গেলে তাকে নানাভাবে নিরুৎসাহ করা হয় অভিযোগ না করার জন্য৷ তবু মেয়েটি অভিযোগ করেছিল, আর তার পরেই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে তাকেই হাজতে পোরা হল৷ তার পর? গোটা সিনেমাটা বলা সম্ভব নয়, তা জানতে হলে সিনেমাটি দেখতে হবে৷

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরি পরিচালিত ‘পিঙ্ক’ ছবিতে মূল ঘটনার সূত্রপাত একটি রক কনসার্ট। সেখানে আলাপের পর এক রিসর্টে অল্পবয়সী একদল তরুণ-তরুণীর খানাপিনা করতে যাওয়া এবং খুব তাড়াতাড়ি দুজন দুজন করে এক-একটি কটেজে ঢুকে পড়া……..৷ এত দূর পড়ে তেমন ছবির আশা নিয়ে দেখতে গেলে আগেই বলে রাখি হতাশ হতে পারেন৷ কারণ ছবির মূলে যাই থাকুক না কেন ছবির দৃশ্যে তা মিলবে না৷ সংস্কার ভেঙে খোলামেলা ছবি দেখিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে যারা সাবালক করতে চান পিঙ্ক দেখলে হয়তো তাঁদের কাছে এ ছবি বালখিল্যদের উপযুক্ত মনে হতে পারে৷ এখানে কনসার্টের কানফাটানো গানের সঙ্গে তাল দিয়ে ছেলেমেয়েদের কোমর দুলিয়ে নাচার কোনও দৃশ্য নেই। তরুণ-তরুণীরা রিসর্টে গিয়ে খানাপিনা করতে করতে ননভেজ জোকস বলাবলি করলেও ছবির দৃশ্যে তা অনুপস্থিতই থেকে যায়৷ তেমন উদ্দেশ্য নিয়ে দেখতে গেলে একেবারে ছবির শেষে এন্ড টাইটেলে তেমন কিছু ক্লিপিং দেখা গেলেও তাতে ওই ব্যাপারে কোনও ভাবেই মন ভরবে না৷ বরং এ ছবি এক দিক থেকে সপরিবারে দেখতে আসা চলে৷ তবে অবশ্যই সন্তানসন্ততিরা যেন মানসিক দিক থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়৷ ছবিতে এমন কিছু দৃশ্য নেই যা সপরিবারে দেখতে বসে অস্বস্তি হতে পারে৷ বরং বর্তমানে ছেলেমেয়েদের জীবনযাত্রা আচরণের ক্ষেত্রে একটা সতর্কবার্তাই দিয়েছে সুজিত সরকার ও রশ্মি শর্মা প্রযোজিত এই ছবিটি৷ ছেলেদের যেমন অবশ্যই বোঝা উচিত কোনও মেয়ে হেসে কথা বলল বা একসঙ্গে ডিনার করল (এমনকী মদ্যপান করল) মানেই তাকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ার লাইসেন্স পাওয়া গেল এমনটা ভাবা হাস্যকর৷ ঠিক তেমনই মেয়েদেরও সতর্ক হওয়া উচিত তেমনভাবে চেনা নেই জানা নেই এমন কোনও ছেলের সঙ্গে দুম করে ডিনার কিংবা মদ্যপানে রাজি হয়ে যাওয়ার বিপদ সম্পর্কে৷ সব কিছু অবিশ্বাস করা যেমন কাম্য নয়, তেমনই কারও কোনও প্রস্তাবের পিছনে কোনও অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা সে বিষয়েও সজাগ থাকা উচিত৷ এই কারণেই অভিভাবকরা অনেক সময়ই নিজেদের টিন-এজার ছেলেমেয়েদের নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন৷ কারণ কোনও ছেলে বা মেয়ের অযথা বেপোরোয়া মনোভাব তাদের জীবনে বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে৷ মেয়েদের বিপদ আরও বেশি, তার কারণ কিছু ঘটলে এদেশের সমাজ এখনও তাদেরই গাল পাড়ে৷ অধিকাংশ সময়েই ছেলেরা তাদের ‘ছেলেমানুষি’র জন্য পার পেয়ে যায়৷ এদিকটাতেই আরও বেশি করে জোর দিয়েছে ‘পিঙ্ক’ ছবিটি৷
এমনই আমাদের সামাজিক কাঠামো যে, ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটলে মেয়েটির পরিবারের লোকেদের সামাজিক দিক থেকে অস্বস্তি বাড়ে৷ কারণ এই বিষয়ে যে কোনও প্রশ্নই তখন পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে৷ মেয়েটির স্বভাব চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন এমনভাবে তোলে তথাকথিত সমাজ যে, সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়াটাও বড় কঠিন হয়ে পড়ে৷ ‘পিঙ্ক’ছবিটা দেখতে গিয়ে ৩৪-৩৫ বছর আগে তপন সিংহ পরিচালিত ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ছবিটির কথা বার বার মনে হচ্ছিল৷ সেখানে এক মাঝবয়সী স্কুলশিক্ষিকা (তনুজা) গোপালপুর অন সি-র নির্জন সৈকতে স্নান করতে গিয়ে ধর্ষিতা হয়েছিলেন৷ সেখানেও ধর্ষকদের পাণ্ডা ছিল ধনী এবং প্রভাবশালী রাজনীতিকের ছেলে৷ তবুও সাহস করে বিচার চাইতে তাদের বিরুদ্ধে ওই শিক্ষিকা আদালতে গিয়েছিলেন৷ আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিকের এই ছবি নিয়ে তখন রীতিমতো আলোড়ন পড়েছিল৷ অমন ঘটনার প্রেক্ষিতে ছবিটি তৈরি হলেও তাতে সেই অর্থে কোনও ‘খারাপ দৃশ্য’ব্যবহার করেননি পরিচালক ৷ যদিও ছবিটিকে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বলেই চিহ্নিত করা হয়েছিল৷ তার কারণ, ওই ছবির একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আদালতে সওয়াল-জবাব৷ সেই সওয়াল-জবাবে এমন কিছু প্রশ্ন এসে পড়েছিল যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে সপরিবারে বসে দেখার পক্ষে সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ছিল অবশ্যই অস্বস্তিকর৷‘রেপ’-‘ধর্ষণ’ইত্যাদি শব্দগুলি তখন প্রকাশ্যে বলতে গেলে অনেকেই অস্বস্তি পেতেন৷ এমনকী, বাংলা খবরের কাগজেও তখন ধর্ষণের চাইতে ‘বলাৎকার’ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হত৷ এবং ধর্ষণের খবরও বের হত ছোট করে, ভিতরের পাতায়৷ ইদানীং বাংলা সংবাদপত্রের সামনের পাতায় তা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে৷ সেইসঙ্গে বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমের প্রসারের কারণে শব্দগুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আগের মতো কুণ্ঠা অনেকটা কেটে গিয়েছে৷ বিশেষত পার্কস্ট্রিট কাণ্ড, নির্ভয়া কাণ্ড সহ যেভাবে বাংলার সংবাদ শিরোনামে এসেছে তাতে ইত্যাকার ভাষাগত ছুতমার্গ নেই বললেই চলে ৷ ‘পিঙ্ক’ ছবিতে আদালতে মেয়েটি ও তার দুই বন্ধু বিচার চাইতে গেলে পাশে পেয়ে যায় দুঁদে অথচ নিজের পেশায় আউটকাস্ট এক উকিলকে (অমিতাভ বচ্চন)৷ ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ছবিটিতে অবশ্য ধর্ষিত শিক্ষিকা তাঁর পাশে পেয়েছিলেন তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকে (মনোজ মিত্র)৷ সৌভাগ্যক্রমে, ওই সাংঘাতিক ঘটনার আগে হাওড়া স্টেশন থেকেই ট্রেনে যিনি ছিলেন একজন প্রাইম উইটনেস৷
এ রাজ্যের ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের পাশাপাশি দেশজুড়ে ‘বেটি বাঁচাও’-‘বেটি পড়াও’কর্মসূচি চলছে ঠিক তখনই আবার কামদুনি-গুড়াপ কিংবা বুলন্দসরের মতো পৈশাচিক ধর্ষণকাণ্ড ঘটে যাচ্ছে৷ এই আয়রনি মানতেই হচ্ছে ৷ ‘পিঙ্ক’ছবিতে অভিযুক্ত মেয়েটির কাছে তার উকিল আদালতে দাঁড়িয়ে জানতে চাইছেন, সে ‘ভার্জিন’কি না৷ সে স্বীকার করছে প্রেমিকের সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কের কথা৷ কিন্তু রিসর্টে মেয়েটির উপর জোর করা হয়েছিল, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ তার উপর জোর খাটাতে গিয়েছিল বলেই সে আঘাত করেছিল৷ আর তার এই কথাই আদালতের রায়ে তার প্রতিপক্ষকে ‘অপরাধী’ হিসাবে চিহ্নিত করে দিল৷ ‘পিঙ্কে’র এটাই আসল বার্তা৷ সব কিছু জোর করে আদায় করা যায় না৷ করলে সেটা অপরাধ বলেই গণ্য হয়৷ ‘না’-এর মানে ‘না’ই৷ প্রত্যেকের ভিতরে এই উপলব্ধিটা এলে কমবয়সী ছেলেমেয়েদের সম্পর্কটা আরও অনেকটা সহজ হয়ে যাবে৷