বাঙালির দুর্গোৎসব মানেই ঠাকুর দেখার ফাঁকে শাড়ি পরা ঐ মেয়েটির দিকে এক পলক দৃষ্টি আর অবান্তর প্রেমে ডুবে থাকা

1182
suchismita
শুচিস্মিতা রায়

সকালেই রেডিওতে ‘বসন্ত এসে গেছে’ গানটা শুনছিলাম। কিন্তু আশ্বিনের শুরুতে বসন্ত ? কোথায় পেল রেডিও চ্যানেল ! এখন তো শরৎকাল৷ চারিদিকে ঝলমল করছে ঝাঁ চকচকে রোদ৷ আকাশের বুকে লুকোচুরি খেলছে মেঘবালিকার দল৷ শহর ছাড়িয়ে একটু বাইরে গেলেই চোখে পড়ছে বনেবাদাড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটে উঠেছে কাশফুল৷ আর কদিন বাদেই যে ‘পুজো’৷ তাহলে এমন ‘অকাল বসন্তের’ কারণ ?

আসলে শরৎই হোক বা ভরা শ্রাবণের ঘোর বর্ষা ৷ মানুষের মনে বসন্ত লেগে থাকে ১২ মাস৷ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন না, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত৷ তাই দুর্গোৎসব বা সরস্বতী পুজো, বাঙালির মনে সর্বদাই উদার প্রেম প্রেম ভাব। দুর্গোৎসব মানেই বাঙালির মধুর সম্মেলন। এক তার সুরে বাঁধা পরে সকল বাঙালির মন। আর তাই মনের বসন্তে রঙ একটু আধটু লেগেই যায়৷ মনের ক্যানভাসে নেল পলিশের আঁচড় তাদেরই বেশি লাগে, যাদের সবে মাত্র দেখা দিয়েছে গোঁফের রেখা৷ উল্টো দিকে আবার, যাদের স্বপ্নের অভিনেতা কে দেখে মনের প্রথম ভালোবাসার কুঁড়ি জন্মেছে, তাদেরও কিন্তু ‘আয়নায় দাগ লেগে যায়’। এদের জন্য দুর্গাপুজো হল সেই প্রথম ইচ্ছেগুলোকে কাছে পাওয়া৷ অনুভব করা৷ আবার দূর থেকে এক  পলক দেখে পুলকিত হওয়া। বাঙালির প্রেম নিবেদন বা প্রেম বিনিময় সবসময়ই আলাদা মাত্রা আনে। কেউ সরাসরি একটা লাল গোলাপ হাতে ধরিয়ে ফিল্মি কায়দায় প্রপোজ করে বসে৷ আবার কেউ কেউ চালাকি করে পুষ্পাঞ্জলির হলুদ গাঁদাটা পিঠে ছুঁড়ে প্রেম নিবেদনের চেষ্টা করে৷ এই ছোঁড়াতেই ধরা পরে তার ‘পেরেম’ ৷ যার ছোঁড়ায় যত পরশ, তার নিবেদনে তত প্রেম ৷ আর এই ছোঁড়ার মধ্যেই জানিয়ে দেয়, ‘ ভিড়ের মাঝে তুমি একদম আলাদা’৷

দুর্গোৎসবের প্রেম বিনিময়ের উপযুক্ত ক্ষণ হল অষ্টমীর শারদপ্রাতে ওই অঞ্জলির সময় টা ৷ বঙ্গললনারা চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরে মণ্ডপে উপস্থিত হবেই হবে। আর পাঞ্জাবি পরা(কেউ আবার তখন ধুতির কোঁচা সামলাতে অস্থির ) সুপুরুষ তরুণদের চোখ এমন ভাবে তাকাবে যেন জীবন্ত বিগ্রহ দেখছে চোখের সামনে৷ অথচ এর ঠিক দু দিন আগেই কিন্তু জিনস পরে দেখেছিল তাকে৷ তবে আজ কি সুন্দর পরিপাটি করে সেজে এসেছে৷ যেন সাক্ষাত দেবী। এদিকে অঞ্জলীর সময়, পুরুতমশাই মন্ত্রপাঠ শুরু করে দিয়েছে। মেয়েটা চোখ বন্ধ করে ফেলেছে গভীর ভক্তি ভরে। কিন্তু মণ্ডপের ‘কাঁচা কার্ত্তিক’ তা আর পারছে কোথায়? এক দৃষ্টে চেয়ে আছে ওই শাড়ি পরা, পরিপাটি করে সেজে আসা মেয়েটির দিকে । মন তোলপাড় করে চলেছে৷ একটি বার যদি ফিরে চায় সে! কিন্তু সে তো চোখ বন্ধ করে , হাত জোর করে, প্রণামের মন্ত্র উচ্চারণ করেই চলেছে৷ ছেলেটির মনের উথাল পাথালের হদিশ কোথায় পাবে? অবশেষে থামল মন্ত্রপাঠ। সে মাথা ঠেকিয়ে গভীর একটা প্রণাম করলো। এদিকে ছেলেটির আর তর সইছেনা! মনে ঘুরপাক খাচ্ছে অনেক না বলা কথা, গহিন অনুভূতি। আলাপ করে নামটা জানবে? আজই কি নাম্বারটা চাইবে কথা প্রসঙ্গে ? এই সব ভাবতে ভাবতে সুন্দরী যে কখন সামনে দিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে প্রস্থান করেছে সে খেয়ালই নেই !আরকি, কপালে লবডঙ্কা !

এতো গেলো ব্যর্থ প্রেম কাহিনী, যা শুরুর আগেই শেষ। অনেক সময় পটীয়সী তরুণীরাও পাড়ার পল্টুকে সাদা শেরওয়ানীতে দেখে ‘হার্টথ্রব ঋত্বিক’ ভেবে গলে পরে প্রেমে। ব্যাস, তখন আর রুখবে কে?! প্রেম যেন তখন উড়ো জাহাজের মতো ‘হুউউইশ’ করে উড়ছে ।

তবে ভেঙে পরার কোনও কারণ নেই। যাদের প্রেম নবমীর দিন আরম্ভ হতে চেয়েও সাহসের অভাবে পারেনি, দশমী তাদের জন্য নতুন ডালি নিয়ে হাজির। কেউ বলে পুজোর প্রেম বিসর্জনেই শেষ৷ কারুর ক্ষেত্রে সেটা একে বারেই উল্টো। এটা বলতে গিয়ে ঈশান ব্যান্ড-এর ‘সুন্দরী’ গানটা মনে পড়লো, ‘…শুভ বিজয়া বলে আলাপ আমার ,তার সঙ্গে…’।উফ কি উদ্দীপক গানের কলি তাইনা ? প্রেমই শেখায় কখনও হার মানতে নেই। তবে প্রেমের তো কোনও বয়স সীমা নেই। হঠাৎ ‘উৎসব’ সিনেমাটার একটা দৃশ্য মাথায় এলো যেখানে ঋতুপর্ণা প্রতিমা বরণ করতে গিয়ে এক ঝলক ঘুরে তাকায় স্বামীর দিকে। নব বিবাহিতা বধূটিও যদি এমনভাবেই তাকায়, কোনও স্বামী আবার নতুন করে প্রেমে না পড়ে থাকতে পারে ? তাই আর কয়েকটা দিনের অপেক্ষা মাত্র। যাদের জীবনে এখনও গ্রীক দেবতা কিউপিড প্রেমের তীর ছোঁড়েনি, তাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ হল আসন্ন অক্টোবর। অবশ্য পুরাতন প্রেম ও নবপ্রেম-জালে ঢাকা পড়ে কি না সেটাও প্রকাশ্য ! তাই ‘বলো দুর্গা মাঈ কি জ্যায়’ বলে লেগে পড়ো ৷ যা থাকে কপালে ! এই শহরই জানুক তোমার প্রথম সব কিছু। দুগ্গা দুগ্গা !

শুচিস্মিতা রায়, দা ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটি কলেজ