শিল্পীকে সম্মান দিতে জানেনা কলকাতা: পৌলমী গাঙ্গুলী

1539

ছোটোবেলায় ভূতে ভয় ছিল ৷ এখন ভূত নয়৷ ‘মানুষ ভূতে’ই যত্ত ভয় পৌলমীর৷ বাংলাদেশ সফর সেরে থেকে সদ্য দেশে ফিরে Campus-এর সঙ্গে নির্ভেজাল আড্ডা দিলেন সঙ্গীত শিল্পী পৌলমী গাঙ্গুলী৷

ক্যাম্পাস: অনেকদিন পর দেখা হল ৷ কেমন আছ?

পৌলমী গাঙ্গুলী: খুব ভালো আছি৷ নতুন নতুন কাজ করছি৷ তুমি কেমন আছো?

ক্যাম্পাস: ভালো৷ একটা বাংলা ধর্মীয় চ্যানেলের অনুষ্ঠানে পৌলমী গাঙ্গুলীকে কলকতায় শেষ দেখা গিয়েছিল৷ তারপর আর পাত্তা নেই৷

পৌলমী গাঙ্গুলী: পাত্তা নেই বলা ঠিক না৷ আমি এখন পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে মুম্বইতে চলে গিয়েছি৷ ফলে কলকাতায় থাকছিনা৷ তাই দেখা যাচ্ছেনা বলতে পারো৷

ক্যাম্পাস: কলকাতা ছাড়ার কি কোনও নির্দিষ্ট কারণ আছে?

পৌলমী গাঙ্গুলী: অবশ্যই(বেশ জোর দিয়ে)

ক্যাম্পাস: কি সেই কারণ?

পৌলমী গাঙ্গুলী: দেখো প্রথমেই বলি আমার ছোট থেকে বড় হওয়া সমস্তটাই রবীন্দ্র সংগীতকে কেন্দ্র করে৷ ছোট বেলায় বাবার থেকে তালিম৷ তার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিয়েই পড়াশুনো৷ এরপর আমি পিএইচডিও করেছি এই একই বিষয়ে৷ সেখানে কলকাতায় একজন শিল্পীকে  কলকাতার সংগঠকরা নুন্যতম মূল্য টুকুও দেয়না৷ বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকরা৷ এখানে শিল্পীকে গান গাইতে গেলে পয়সা দিতে হয়৷ কিন্তু বাইরে তা নয়৷ সেখানে প্রাপ্য সম্মান তোমাকে দেবে৷ আমি খুব বেশি টাকা পয়সার কথা বলছিনা৷ কিন্তু, অন্তত সম্মানজনক একটা সম্পর্কতো থাকবে৷  এখানে সেটাও নেই৷

ক্যাম্পাস: তুমি রবীন্দ্র সংগীত নিয়ে চর্চা কর৷ কিন্তু মুম্বইতে থাকলে সেই শ্রোতা পাবে?

পৌলমী গাঙ্গুলী: আমি এখন রবীন্দ্র সংগীতের পাশাপাশি, হিন্দি গান করছি৷ সম্প্রতি একটি হিন্দি ছবিতেও প্লে-ব্যাক করেছি৷ রেকর্ডিং হয়ে গিয়েছে৷

ক্যাম্পাস: তাই নাকি? গল্ফগ্রীনের মেয়ে হিন্দি ছবিতে গান গাইছে এতো বিরাট ব্যাপার৷ কোন ছবি?

পৌলমী গাঙ্গুলী: (হাসি মুখে) নানা এখনই এই ছবির নাম আমি নিচ্ছিনা৷ তবে আগামী ডিসেম্বরেই ছবির ট্রেলর মুক্তি পাবে৷ তখন সব জানতে পারবে৷

ক্যাম্পাস: কলকাতা ছাড়লে পরিবার এটাকে সমর্থন করলো?

পৌলমী গাঙ্গুলী: হ্যাঁ নিশ্চই৷ পরিবার না থাকলে পৌলমী গাঙ্গুলীও থাকতোনা৷ আমার স্বামী(রাজা দাসগুপ্ত) ও ছেলে আমায় এর জন্য এনেক সাপোর্ট করেছে৷ আর সবথেকে সুবিধা হয়েছে, কয়েকদিন আগে আমার স্বামীর কাছে একটা অফার আসে মুম্বই ও অন্য একটি শহরে বদলি নেওয়ার ৷ আমার স্বামী শুধুমাত্র আমার সুবিধার জন্য মুম্বই সিলেক্ট করে৷ আর আমার ছেলে আমার বন্ধু৷ বয়সে অনেকটা ছোট হলেও সে আমার সমস্যাটা ভালোই বুঝতে পারে৷ তাই সে কখনোই কোনও আপত্তি করেনি৷

ক্যাম্পাস: মুম্বইতে সূর্যাস্তের পর দিন শুরু হয়৷ তোমার সকাল কখন হয়?

পৌলমী গাঙ্গুলী: যেহেতু আমার খুব ভোরে ওঠার অভ্যাস রয়েছে, তাই ঘুম ভেঙে যায়৷ আর এখানে সারারাত ম্যারিন ড্রাইভে এসে লোক বসে থাকে৷ যেন মেলা বসে রোজ৷ আমরাও যাই৷

ক্যাম্পাস: একা যাও নাকি সঙ্গে কেউ থাকে?

পৌলমী গাঙ্গুলী: অধিকাংশ সময় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাই৷ কখনো-সখনো আমার স্বামীও থাকে৷ আমরা এখানে খুব ভালো আছি৷
02

ক্যাম্পাস: কলকাতায় ভালো ছিলেনা বলতে চাইছো?

পৌলমী গাঙ্গুলী: না তা নয়৷ দেখ আমার যখন মাত্র সাড়ে চার বছর বয়স তখন আমার ফিরোজা বেগমের একটি অনুষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য হয়৷ অনুষ্ঠানটি হয়েছিল, যাদবপুর ইউনিবার্সিটিতে৷ আমার এক দাদা আমার মা ও বাবাকে দুটো পাস জোগাড় করে দিয়েছিল৷ আমি সেদিন দেখেছিলাম, মানুষের মধ্যে গান শোনার কি উন্মাদনা৷ সবাই গভীর আগ্রোহে গান শুনছে৷

ক্যাম্পাস: এখনও তো কত অনুষ্ঠান হয়৷ কত মানুষ যায়৷ এখনওতো উন্মাদনা আছে৷ তাহলে তুমি নেই বলছো?

পৌলমী গাঙ্গুলী: আছে৷ তবে এখন সমস্তটাই অবাধ দ্বার৷ যে পারছে ঢুকে যাচ্ছে৷ কখনো হয়তো কোনও দিন গান শোনেই নি ৷ সেও ঢুকে যাচ্ছে৷ আজ তেকে প্রায় বছর ২৫ আগে ফিরোজা বেগমের সেই অনুষ্ঠানের পাস জোগাড় করতে অনেক কাঠখর পোড়াতে হয়েছিল আমার দাদাকে৷ সেই সব এখন ইতিহাস৷

ক্যাম্পাস: আচ্ছা তোমার কাছ তেকে নতুন কোন অ্যালবাম পাচ্ছি আমরা ?

পৌলমী গাঙ্গুলী: দেখ প্রথমেই তোমাকে একটা কথা বলি, অ্যালবাম নিয়ে আমার কোনও মাতামাতি নেই৷ আমি সোশ্যল মিডিয়াতে গান ছড়িয়ে দিয়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছতে বেশি ভালোবাসি৷ আর তাতেই আমি একটা বাড়তি সাফল্য পেয়েছি৷ আর অ্যালবাম বলতে, সম্প্রতি প্রয়াগ যোশীর সঙ্গে সদ্য একটা হিন্দি অ্যালবামের কাজ শেষ করেছি৷

03

ক্যাম্পাস: তুমি বাংলাদেশের রাজ পরিবারের মেয়ে৷ পদ্মার ওপারে তাই কি বাড়তি খাতির?

পৌলমী গাঙ্গুলী: হ্যাঁ তা খানিকটা বলতেই পারো৷ তবে কি জানো আমার এই পরিচিতির জন্য আমার বাবার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি৷ আমার বাবার জন্য খুব গর্ব হয়৷

ক্যাম্পাস: নিজের সাফল্যের নেপথ্যে কাকে রাখবে?

পৌলমী গাঙ্গুলী: অবশ্যই সবার আগে বাবা৷ আমি নিজে খুব কষ্ট করে বড় হয়েছি৷ রাতের পর রাত সোশ্যল মিডিয়ায় নিজের গান রেকর্ড করে শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরেছি৷ যদি আমাকে দুজনও চেনে তাহলে জানবে সেটা আমার একার পরিশ্রমের ফসল৷

ক্যাম্পাস: ইদানিং গান নিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে৷ রবীন্দ্রসঙ্গীত রিমেক করে বেশির ভাগটাই চেঞ্জ করে দেওয়া হচ্ছে,৷ বিষয়টিকে তুমি কতোটা সাপোর্ট করছ?

পৌলমী গাঙ্গুলী: আজকাল কপি পেস্ট ব্যাপারটা খুব বেড়ে গেছে৷ বাংলা গানের সব সুরই যেন একই রকম৷ এছাড়াও আমি বলব কলকাতার গানের লিরিকের আজকাল আর কোনও মা-বাবা নেই, কলকাতার থেকে বাংলাদেশের লিরিক গুলো বরং আমার বেশি ভাললাগে৷ আর রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বাড়াবাড়ি রকম এক্সপেরিমেন্টটা আমি কখনই সাপোর্ট করিনা৷ গানের নিজস্ব সুর রেখে সেখানে মিউজিকের এক্সপেরিমেন্ট হোকনা৷ তা তো কেউ মানা করছেনা৷ এইতো কয়েক দিন আগে বর্ণ চক্রবর্তীর সঙ্গে বাংলাদেশে একটা গানে কাজ করেছি৷ সেটি ইউটিউবে ছেড়েছি৷ ‘তোকে ছাড়া ভীষণ একা’ গানটি শনো ভাল লাগবে৷ পুরোনো প্রেমের কথা মনে পড়ে যাবে৷

ক্যাম্পাস: সেকি পুরোনো প্রেম?

পৌলমী গাঙ্গুলী: (খুব হেসে) হ্যাঁ, একদম৷

ক্যাম্পাস: তারমানে গান রেকর্ডিং-এর সময় পুরোনো প্রেম মনে পড়েছে৷ পুজোর মরশুম৷ পুজোতে নতুন কারো প্রেমে পড়লে ?

পৌলমী গাঙ্গুলী: (সজোরে হেসে) প্রেমে পড়ার তো কোনো নিষেধ বা মানা থাকেনা৷ তাই প্রেমে পড়াই যায়৷ তবে তাই বলে পুজোর জন্য আলাদা সময় বলে কিছু নেই৷

ক্যাম্পাস: আচ্ছা আমাদের এই ইস্যুর মূল বিষয় ভূত৷ তা ভূতের ভয় পাও?

পৌলমী গাঙ্গুলী: ওরে বাবা৷ ভূতে ভয় পাইতো৷ তবে মানুষ ভূতের ভয় পাই৷ আর ছোটোবেলায় বাবার মুখে খুব ভূতের গল্প শুনতাম৷ তখন ভয় পেতাম খুব৷ এখন সেই সব আণার কাছে সোনালী মূহুর্ত৷

ক্যাম্পাস: আচ্ছা শেষ প্রশ্ন৷ কলকাতায় তোমার একটা মিউজিক ইনস্টিটিউট ছিল৷ তুমি এখন মুম্বইতে থাকছো৷ তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের কি হল?

পৌলমী গাঙ্গুলী: এখনও দিব্যি আছে৷ আমার ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের গান শেখাচ্ছে৷ সেখানে প্রায় ৩০-৩৫ জন আছে৷ এদিকে মুম্বইতেও প্রয়াগ যোশীর সঙ্গে নতুন একটি ইনস্টিটিউট চালু করেছি৷ সেখানে আমি গান শেখাচ্ছি৷ ভালো লাগছে৷

ক্যাম্পাস: অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে৷ তোমার মূল্যবান সময় থেকে ক্যাম্পাসকে সময় দেওয়ার জন্য৷ তোমার নতুন প্লে-ব্যাকের জন্য ক্যাম্পাসের তরফ থেকে শুভেচ্ছা রইল৷

পৌলমী গাঙ্গুলী: নানা সেরকম কিছু নয়৷ অনেকদিন পর খোলা মেলা আড্ডা দিতে আমারও বেষ ভাললাগলো৷ তোমাদের ক্যাম্পাসের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল৷ তোমাদের গোটা টিম কে আমার তরফ থেকে দীপাবলির অগ্রিম শুভেচ্ছা রইল৷