একালের ভূত-কড়চা

737
shashwati
শাশ্বতী বোস

ভূত,Ghost,আত্মা,প্রেতাত্মা-এই ব্যাপারগুলো যেমনই গা ছমছমে, তেমনই ইন্টারেস্টিং। ছোটবেলায় আমি যখন খুব দুষ্টুমি করতাম,আমাকে “ব্রহ্মদত্যি” মশাইয়ের ভয় দেখানো হত,যাতে আমি শান্ত হই। দুর্ভাগ্যবশত খুব একটা লাভ হয়নি। এই ভয়গুলো দিনের পর দিন ভূত ও ভৌতিক ব্যাপারস্যাপার সম্পর্কে আমার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলেছে, তাই যখন সুযোগ পেলাম “ভূতচর্চা” করার, সুযোগটা লুফে নিলাম।
মৃত্যুর পর কি? জলজ্যান্ত মানুষ কি সত্যই ভূতে পরিণত হয়? এই নিয়ে আজও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এতো সহজেই কি মৃত ব্যক্তি ইহজগতের মায়া ছাড়াতে পারে? মায়া কি ক্ষণিকের বিষয়বস্তু? প্রশ্ন অনেক, উত্তরগুলো বেশ ঝাপসা। তবে ভূত নিয়ে মাতামাতি কিন্তু খালি বিশেষ কয়েকজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ভূতচতুর্দশী, হ্যালোইন -এই গোত্রের উৎসবগুলিও বিভিন্ন দেশে ‘ভূত’ ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ভাবুন একবার, ভূত নিয়ে আস্ত একটা উৎসব!
‘ভূতচতুর্দশীর’ সঙ্গে আমরা বাঙালিরা বেশ পরিচিত।অশুভ শক্তিকে দূর করতে, ঘরে ঘরে ১৪ টি প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রাক-দীপাবলিতে পালিত হয় এই ভূতচতুর্দশী। এখন আলোর মূর্ছনাতে ভূত বাবাজী কতটা দূরে পালিয়ে যান সেটা জানিনা কিন্তু শব্দবাজীর দাপটে ধারে কাছে ঘেঁষার প্ল্যানটা নির্ঘাত বাতিলই করে দেন। ভূত বলে কি তাঁদের অনুভূতি নেই নাকি? আলবাত আছে। এটি ছাড়াও তান্ত্রিক,ওঝা প্রভৃতি পেশার মানুষজন প্রতি মুহূর্তেই তৎপর থাকেন ভূত তাড়াতে। সত্যিই! মাঝে মাঝে মায়াই লাগে, “তেঁনারা” ঠিক কেমন আছেন, বড় জানতে ইচ্ছা করে।
এতো গেল দেশীয় ভূত-কাহন, বিদেশের হ্যালোইন উৎসব সম্পর্কে আমরা কিন্তু প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর জানি। প্রতি বছর ৩১ শে অক্টোবর দিনটিকে “হ্যালোইন ডে” হিসাবে পালন করা হয়। “হ্যালোইন” শব্দের অর্থ হল-শোধিত বা পবিত্র সন্ধ্যা।বিশেষজ্ঞদের মতে, আনুমানিক ১৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে উৎপত্তি ঘটে “হ্যালোইন” শব্দটির।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হ্যালোইন উৎসবের খ্যাতি গোটা বিশ্বে বর্তমান। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, পুয়ের্তো রিকো, জাপান, নিউজিল্যান্ডেও পালিত হয় এই হ্যালোইন উৎসব।তবে বিশ্বায়নের হাওয়ায় ভারতেও বছরকয়েক ধরে হ্যালোইন উৎসব পালন করা শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, “হ্যালোইন” বা “অল্ হ্যালোজ্ ইভ্” হলো খ্রিস্টধর্মের একটি বার্ষিক উৎসব, যা প্রাথমিকভাবে কেলটিক ফসল কাটার উৎসব দ্বারা প্রভাবিত। অন্যান্য পণ্ডিতদের মতে, এই উৎসবটির উৎপত্তির মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রভাবই ছিল মূল বিষয়।তবে ভূত সম্পর্কীয় উৎসব হলে কি হবে, এটিকে কিন্তু ব্যাপক মজার আঙ্গিকেই পালন করা হয়। ভূতুরে পোষাকে সেজে, বাড়ি বাড়ি ‘ট্রিক অর ট্রিট’ করে, বন-ফায়ার জ্বালিয়ে, ভূতুরে জায়গায় বেড়াতে গিয়ে, সিনেমা দেখে-এক ব্যাপক সমারোহের মাধ্যমে বিদেশে পালিত হয় এই ভূতচতুর্দশী ওরফে হ্যালোইন।
তবে দেশ ভারত হোক কিম্বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভাষা বাংলা হোক কিম্বা ইংরাজী, মানুষ মাত্রেই সবসময় অশুভ শক্তি বা পরিবেশ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চায়, দুষ্টের দমন করে শিষ্টের পালন করতে চায়। তাই উৎসবের মাধ্যমেই অতৃপ্ত আত্মা, ভূত-এই ব্যাপারগুলিকে জীবন থেকে সরিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে। তবে এইক্ষেত্রে বিশ্বাস,বুজরুকি ও বাণিজ্য-সমান তালে কাজ করে।
অতঃপর একটা কথা স্বীকার না করলেই নয়, এই অদ্ভুত-কিম্ভুত-ভৌতিক ব্যাপারস্যাপার গুলি কিন্তু আজও মানুষের মনে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। “তেঁনারা” ভালো থাকুক, ভালো রাখুক সবাইকে। পৃথিবীর যে আজ সত্যিই “রায়বাবুর” তৈরি করা “ভূতের রাজা” বড্ড দরকার। যে রাজা এসে মানুষের মন থেকে সমস্ত অশুভকে বার করে, শুভবুদ্ধি প্রদান করবে।