চাকরির পরীক্ষা দিতে গিয়ে, ভেঙে না পড়ার গল্প

819

শেখর ভারতীয়: ২০১১ থেকে ২০১৬ টানা সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়ে সমাদৃত মজুমদারের হাতে এসেছিল ‘আর্যভট্ট আবিষ্কার’। সমাদৃত, অর্ণব, আরণ্য, ঋয়াংশু এই চারবন্ধুতে মফঃস্বল থেকে কলকাতা এসেছিল চাকরির পরীক্ষার প্রিপারেশন নিতে। ৫ বছর কেটে গিয়ে সফলতা অধরা। সমাদৃত বাদে বাকিরা ফিরে গেছে গ্রামে। কলকাতায় থাকা-খাওয়ার জন্য টিউশন পড়ানো শুরু করল ছেলেটা। অদ্যম জেদ, খালি হাতে বাড়ি ফিরবে না।

আমার সঙ্গে যখন পরিচয় তখন টিউশনগুলো ছেড়ে কলকাতায় একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ শুরু করেছে সমাদৃত। নামে ১০টা-৫টার জব কিন্তু কাজে ১০টা-১২টা। একটা কাজের জন্য যতটা পরিশ্রম করা যায় তা থেকে এক দু পয়েন্ট বেশি পরিশ্রম করেও মাসের শেষে হাতে যা আসত তা দিয়ে কলকাতা শহরে একটা ভালো বাড়ি ভাড়া নেওয়া যায় না। এদিকে বাড়ি থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করেছে। অতএব বন্ধুদের কাছে কিছু ধার দেনা হয়ে গেল। সে সব শোধ করা তো দূরের কথা, রোজ বেড়েই চলল ধার। পরিস্থিতি এমন জায়গাতে পৌঁছলো যে চাকরির পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা লাটে উঠল। এক বছরে গ্রুপ ডি থেকে সুইপার সমস্ত রকমের চাকরির পরীক্ষায় ফেল করল। এদিকে সমাদৃত তখনও বুঝে উঠতে পারছে না এই প্রাইভেট ফার্ম থেকে আসলেই ওর জীবিকা নির্বাহ সম্ভব কিনা। একদিন ভোরে আমার রুমে এলো বিভ্রান্ত অবস্থায়, উসকোখুসকো চুল ঘোলাটে চোখ নিয়ে।
-কী রে এ কী অবস্থা তোর? আর এত সকালে কোথা থেকেই বা আসছিস?
প্রশ্ন শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল আমার মুখের দিকে। চোখ থেকে জলের ধারা বেরিয়ে আসতে শুরু করল। কিছু কিছু সময় মানুষ বুঝতে পারে না সে কাঁদছে। আর কোন প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল না। নিজেই বলল,
– ওই যে রাস্তার পাশে বাথরুমের দেওয়ালে যে সব ফোন নম্বর লেখা থাকে, “সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ভালো আয় করুন” সেখানে ফোন করেছিলাম। আর চলছিল না বুঝলি। ৫ মাসের ভাড়া বাকি, পকেটে কোনও টাকা নেই যে মাস চালাব। যাদের কাছে ধার নিতে পারতাম নিয়ে নিয়েছি। আর পারছিলাম না, বাধ্য হয়ে গিয়েছিলাম বুঝলি।
বলেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল ছেলেটা। এর উত্তরে কী-ই বা বলতাম? বললাম, ছাড় এসব কথা, চল চা খেয়ে আসি। আমার রুম থেকে অটো ধরে কাশীপুর উদ্যানবাটী যাওয়া যেত। গেলাম ওকে নিয়ে যদি মনটা ভালো হয়। ওখানে গিয়ে কিছুটা ধাতস্থও হল। কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে গঙ্গার পাড়ে এসে বসলাম। এক বয়স্ক লোক, এই প্রায় ছ’ফুটের কাছাকাছি হবেন, আমাদের পাশে এসে বসলেন।
– কী করা হয় বাবারা?
– এই, পড়াশুনো করি।
– কী পড়ো?
– চাকরির পরীক্ষার জন্য।
– কত বছর ধরে পড়ছো?
ভালো লাগছিল না এই সব উটকো প্রশ্ন। বললাম
– কিছু মনে করবেন না, যদি আমাদের একা ছাড়েন খুব ভালো হয়।
– বুঝেছি, অনেক বছর পরীক্ষা দিচ্ছো। কিন্তু পাচ্ছো না।
বুঝলাম বুড়ো নাছোড়বান্দা। তাই অগত্যা আমিই ওঠার চেষ্টা করলাম।
– বোসো বোসো, এটুকুতেই উৎসাহ হারলে চলে? বিনা অনুমতিতে বিরক্ত তো করেই ফেলেছি তোমাদের, বরং দু-মিনিট বসে যাও তারপর যেও। আমি একটা ঘটনা বলতে চাই তোমাদের।
– বয়স্ক লোকটির বলার মধ্যে কীরকম একটা দৃঢ়তা ছিল, কাটতে পারলাম না। বসে পড়লাম।

(২)
সমাদৃতর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর এসবে কোনও খেয়াল নেই। ফ্যাকাশে চোখে গঙ্গা দেখছে।
বৃদ্ধ লোকটি শুরু করলেন,
চ্যাটার্জি অ্যান্ড চ্যাটার্জি কম্পিউটারস এর নাম শুনেছো? মাথা নেড়ে জানালাম না। চ্যাটার্জি কম্পিউটার শুরু করেছিল নির্মল চ্যাটার্জি। এই কোম্পানিটি খোলার আগে পারিবারিক রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা করত নির্মল চ্যাটার্জি। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাশ করে নিজেদের পারিবারিক ব্যবসায় ঢুকে পড়েছিল নির্মল। উদ্যমী যুবক। তার উপর ইনোভেটিভ আইডিয়া। রেষ্টুরেন্টের ব্যবসা ফুলতে ফাঁপতে লাগল। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু টাকা আর সাফল্যের স্পর্শ পেলে সাধারণ মানুষের যা হয় আর কি৷ নির্মলেরও মাথা ঘুরে গেল। মদ, গাঁজা, হেরোইন থেকে মেয়ে সব রকমের নেশায় পেয়ে বসল প্রচন্ড উদ্যমী ছেলেটিকে। মালিকের পদস্খলন হলে দোকানের দেওয়াল পড়তে বেশি সময় লাগে না। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হল না। মাত্র একবছরেই রেষ্টুরেন্ট নিলামে উঠল। মার্কেটে তখন কয়েক লক্ষ টাকার ধার। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে নির্মল। ততদিনে নির্মলের চৈতন্য তো হয়েছে, কিন্তু ওকে সাহায্য করা তো দূর, দেখলেই ছিঁড়ে খাবে পাওনাদাররা৷

এরকম সময় গঙ্গার এই ঘাটে আজ তোমারা যেখানে বসে আছো ঠিক তার কয়েক সিঁড়ি নীচে বসে ছিল ও। ভাবছিল অনেক হয়েছে, এবার টুক করে আত্মহত্যাটা করে নিলে ল্যাঠা চুকে যায়।
– কী জলে ঝাঁপাবে ভাবছো? মরে গেলে কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে না।
ঠিক যেমন আজ আমি তোমাদের সঙ্গে যেচে কথা বলছি সেরকমই একজন লোক সেদিন খেজুরে আলাপ জুড়ে নির্মলের সঙ্গে।
– তোমার সমস্যাটা কী আমাকে বলা যায়?
– কী করবেন শুনে?
– কিছু হয়ত করতে পারবো না, কিন্তু তোমার কথাগুলো তো শুনতে পারবো।
আস্তে আস্তে ব্যবসার শুরু থেকে শেষ সবটা বলেছিল নির্মল।
– কত টাকা হলে তোমার ধার মিটে যাবে?
– অনেক টাকা, সে অনেক টাকা।
– অনেক মানে কত? শুনিই না?
– তা ধরুন প্রায় ১০ লাখ।
প্যান্টের পকেট থেকে একটা চেক বুক বের করে ১২ লক্ষ টাকার একটা চেক কেটে দিয়ে ভদ্রলোক বলেছিলেন, যাও আবার শুরু করো।
– কিন্তু এত টাকা? আপনি? আমার মতো একজন অচেনা লোককে? আপনিই বা কে? এত টাকা কোথায় পেলেন?
– আমার নাম বিকাশ সিং। মার্চেন্ট নেভিতে চাকরি করতাম, বছর দুয়েক হল রিটায়ার্ড করেছি। বিহারে কিছু জমি জায়গা ছিল সেগুলো বেচেছি ব্যবসা করব বলে। তুমি তো একবার ব্যবসা করেছো তাই তোমাকে দিলাম। তুমি শুরু করো। ১২ লক্ষ টাকা উঠে আসার পর আমরা ৫০ শতাংশের পার্টনার হবো।
– আপনি কোথায় থাকেন? উত্তরে গঙ্গার ঘাটের পশেই একটা ছোট দোতলা বাড়ি দেখিয়েছিল বিকাশ।

১২ লক্ষ টাকার চেকবুক পকেটে নিয়ে আবার ব্যবসায় নেমেছিল নির্মল৷ তবে চেকটা না ভাঙিয়ে নিজের মতো চেষ্টা করেছিল। পুরনো চোট খাওয়া ব্যবসায়িক বুদ্ধি আহত বাঘের থেকেও ভয়ঙ্কর। সঙ্গে প্রচন্ড পরিশ্রম আর হার না মানা লড়াই। বছর পাঁচেকের মধ্যে চ্যাটার্জি কম্পিউটারসের প্রথম ব্রাঞ্চ উদ্বোধন করতে পেরেছিল সে। ১২ লক্ষ টাকার চেক তখনও তার বুক পকেটেই রাখা। এবার সময় বিকাশ সিংয়ের কাছে ফিরে যাওয়া। গঙ্গার ঘাটে ফিরে এসেছিল নির্মল। বিকাশের দেখানো দোতলা বাড়িটাতে গিয়ে খোঁজ নিয়েছিল।
– আচ্ছা এখানে বিকাশ সিং বলে কেউ?
– আপনাকে নিয়ে হল গিয়ে পুরো ১০০ জন। যারা বিকাশ সিংয়ের খোঁজ করে গেছেন এখানে। পাগলটা আপনাকেও চেক টেক দিয়েছিল নাকি? সঙ্গে থাকলে ছিঁড়ে ফেলুন মশায়। ওটা বদ্ধ পাগল, নিজেকে মার্চেন্ট নেভির অফিসার বলে। কোথা থেকে ঝাড়া একটা চেকবুক নিয়ে এসব করে গেছে। এখানেই বারান্দাতে পড়ে থাকত আগে। কে জানে এখন বেঁচে আছে না মরে গেছে। বিকাশ সিংকে আর খুঁজে পায়নি নির্মল কিন্তু ওর ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিকাশ ওকে ওই ভুয়ো চেকটা দিয়ে আসলে বুকে সাহসটা ফিরিয়ে দিয়েছিল। তোমার বন্ধু ইয়ং, ওকে লড়াই করতে বলো, যতদিন চাকরির পরীক্ষায় বসতে পারে। তাতে সাফল্য আসুক আর না আসুক তুষ্টি আসবেই। কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক গঙ্গার ঘাট থেকে উঠে এসে অটো ধরার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। কৌতুহলবশত আমি ওঁর পিছনে অটো স্ট্যান্ড অবধি উঠে এসেছিলাম।
– আচ্ছা আমি যদি খুব ভুল না হই, তাহলে আপনিই নির্মল চ্যাটার্জি, না?
আমার প্রশ্নের জবাবে ভদ্রলোক মুচকি হেসে অটোতে উঠে পড়েছিলেন।

(শেষ)

গঙ্গার ঘাট থেকে রুমে ফিরে এসেছিলাম আমরা। সমাদৃত আবার পড়া শুরু করেছিল। ওকে একা ছাড়ার সাহস হয়নি আমার। নিজের রুমে শিফট করিয়েছিলাম ওকে। কিন্তু প্রায় ৩ বছর পড়াশুনো থেকে বাইরে থাকার জন্য কিছুতেই কনসেনট্রেট করতে পারছিল না৷ WBCS প্রিলিমিনারির তখনও চার মাস বাকি। প্রাইভেট ফার্মের চাকরির পাশাপাশি WBCS -এর জন্য প্রস্ততি শুরু করেছিল সমাদৃত। অফিস থেকে ফিরত ১১ টার সময় তারপর বই নিয়ে বসত। ভোরে উঠে দেখতাম সমাদৃত পড়ছে। WBCS প্রিলিমিনারি হল। সমাদৃত ফিরে আসতেই আমরা কজন মিলে জিজ্ঞেস করলাম কী রে ফাটিয়ে দিয়েছিস তো। ও খুব শান্ত ভাবে বলেছিল কয়েকটা জানা জিনিস ভুল করেছি। দেখি কী হয়। বলে চা টা খেয়ে বই নিয়ে বসেছিল৷ কয়েক মাস পর রেজাল্ট বেরিয়েছিল, ফোনে সবার রোল নম্বর ধরে রেজাল্ট চেক করছিলাম আমরা। রেজাল্ট দেখে আবার থ হয়ে গিয়েছিলাম আমি। রুমের চারজন ছেলের মধ্যে তিনজন WBCS প্রিলিমস পেয়েছিল, কিন্তু সমাদৃত ‘নট কোয়ালিফায়েড”।

রেজাল্ট দেখে মুচকি হেসেছিল সমাদৃত। আমরা তিনজনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে। ভাবছিলাম শালা আজ না নির্ঘাৎ ঘুমের ওষুধ খাবে। সারারাত জেগেছিলাম। কিচেন থেকে ছুরি কাঁচি লাইটার সরিয়ে রেখে এসেছিলাম মাসিমার রুমে। সমাদৃত বাথরুম গেলে দরজা খোলা রাখানোর চেষ্টা করছিলাম। ভোরের দিকে একটু চোখটা লেগে গিয়েছিল, কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম সমাদৃত সুইসাইড করতে যাচ্ছে৷

ধড়মড়িয়ে উঠে দেখি সমাদৃত পড়ছে, রুমের নাইট বাল্বের আলোয় ওকে ঠিক যেন ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো লাগছিল। এ ছেলে আর যাই হোক, সুইসাইড করবে না। বুঝলাম ভগীরথের তপস্যা শুরু হয়ে গেছে। একদিন না একদিন ঠিক গঙ্গা নেমে আসবে, আসবেই।