বলিপাড়ার ‘খান’দানী ব্র্যান্ডিং

881

kinkiniবিনোদন জগতের মূল সারবত্তাই বোধহয় মোড়ক, যাকে সহজ কথায় বলা হয় ‘প্যাকেজিং’। তাই তো ‘এক্সক্লুসিভ’ এবং ‘এলিট’ বলে খ্যাত আমির খান৷ ‘দেবতার মতো মানুষ’-এর ব্র্যান্ডটাই হল ‘ব্র্যান্ড সলমন’, যে ব্র্যান্ডের খাতিরে ফৌজদারী মামলায় সল্লুর শাস্তির খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা দেশ। আর আজও কিং খানের ছবি মুক্তি মানে ভারতীয় তরুণীদের ভ্যালেন্টাইন্স ডে। বলিপাড়ার ‘খান’দানি তিন ব্র্যান্ড নেড়েচেড়ে দেখলেন কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

‘ব্র্যান্ড’ বললেই সবার প্রথমে মনে পড়ে একটা লেবেল বা স্টিকারের কথা। ‘ব্র্যান্ডেড’ পোশাক কেনার সময়ে যেমন পোশাকের গায়ে লাগানো ওই স্টিকার দেখেই বুঝতে পারা যায় এর প্রস্তুতকারী সংস্থার নাম-ধাম, সেইসঙ্গে তা থেকে এটাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে ওই সংস্থা আদতে কোনধরনের পোশাক বানায়। বিনোদনের দুনিয়াও এই ‘ব্র্যান্ডিং’-এরই নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত নয় কোনওভাবেই। ‘ব্র্যান্ডিং’ আসলে যেন একটা মোড়ক, যে মোড়কেই ভিতরের জিনিসটার প্রকৃত পরিচয় দিয়ে দেওয়া হয়। মোড়ক দেখে পছন্দ হলে তবেই ক্রেতা কিনে নেবেন মোড়কসহ তার ভিতরের বস্তু। আর বিনোদন জগতের মূল সারবত্তাই বোধহয় এই মোড়ক, যাকে সহজ কথায় বলা হয় ‘প্যাকেজিং’। প্রশ্ন উঠতে পারে যে বিনোদamir-salluনের জগতে ‘ব্র্যান্ড’ ফ্যাক্টরটা কীভাবে কাজ করে? প্রচারের মাধ্যমটাই কী এই ব্র্যান্ড তৈরি করে? আসলে শুধু প্রচারের বা বিপণনের যে উপায় সেটাই শুধু বিনোদন জগতের ব্র্যান্ডিং নয়, নির্দিষ্ট বস্তুটিকে কীভাবে বক্স অফিসে বিকোতে হবে, সেই প্রক্রিয়াটিই হল ব্র্যান্ডিং।

এবং এই বিনোদনের লাল—নীল দুনিয়াতে সেই নির্দিষ্ট ‘বস্তু’ আর কেউ নয় – আমাদের হার্ট থ্রব নায়ক-নায়িকারাই। আসলে একজন এক্স-ওয়াই-জেড অভিনেতাকে বলিউডের ‘শাহেনশা’, ‘বাদশা’, ‘ভাইজান’, ‘ড্রিম গার্ল’ বানানোর এই প্রক্রিয়াটাই হল ব্র্যান্ডিং। এবং বক্স অফিসে নায়ক-নায়িকাদের এই ব্র্যান্ডটিরই পরীক্ষা হয়। কীভাবে? বলিউডের তিনখানের কথাই ধরা যাক প্রথমে। শাহরুখ-আমির-সলমন এই তিন খান যেন বর্তমান বলিউডের সাফল্যের তিন ভিত্তিস্তম্ভ। কিন্তু তিনজনের ব্র্যান্ডিংটা আলাদা আলাদা, অর্থাৎ এই তিনটি নামের জন্য শুধু যে তিনটি আলাদা দর্শকশ্রেণিই রয়েছে তা নয়, এই তিনটি ব্র্যান্ডের সিনেমার ধরনধারণ-প্যাকেজিং সবই আলাদা। অথচ লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার এতাই যে, এই তিনজনেরই ফিল্মি কেরিয়ার শুরু হয়েছিল প্রায় একইসময়ে, নব্বই দশকের প্রথমদিকে। আমিরের ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক’ ১৯৮৮ তে মুক্তি পায় এবং সলমনের ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’ আসে তার ঠিক একবছর পরে ১৯৮৯ সালে, এর কয়েকবছরের মধ্যেই ১৯৯৩ সালে শাহরুখ খানকে সারা ভারত চিনে নিল ‘ডর’ ছবির মাধ্যমে। এরমধ্যে ‘ডর’ ছাড়া বাকিদুটিই একেবারে হার্ডকোর রোম্যান্টিক ছবি, এবং যেখানে নায়কের ভূমিকা একেবারেই চিরাচরিত রোম্যান্টিক প্রেমিকের, তবে ‘ডর’ এবং প্রায় একইসঙ্গে মুক্তি পাওয়া শাহরুখের সুপারহিট ‘বাজিগর’ রোম্যান্টিক ছবি হলেও শাহরুখের ভূমিকা সেখানে অ্যান্টিহিরোর, তবে অতি অবশ্যই প্রেমিকের। এর বছর দুই পরে ১৯৯৫ সালে ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’ দিয়ে শাহরুখ সরাসরি মূল রোম্যান্টিক নায়কের ভূমিকায় রাজত্ব করা শুরু করেন, ঠিক সেইসময়ে আমিরের ‘রঙ্গিলা’ আর সলমনের ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ও বক্সঅফিস কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে শুরুর সময়ে তিনখানই একই জায়গা থেকে শুরু করেছিলেন, শুরুতে তাঁদের সবারই একইধরনের সিনেমা এবং একইধরনের চরিত্র- তাহলে ব্র্যান্ডের তফাৎটা কোথায়?

ব্র্যান্ডিং-এর তফাৎটা নব্বই দশকের নয়, বরং একেবারেই হালফিলের। টিনসেল টাউনের এই যে তিন বেতাজ বাদশা তাঁদের ব্র্যান্ডিং অর্থাৎ পরিচয় সম্পূর্ণ বদলে নিলেন, একেবারে একই বিন্দু থেকে শুরু করে এটা হল কীভাবে? কিছুই না, তিনsrk-salluখানের অভিনীত ছবি এবং এবং সেই অনস্ক্রীন ইমেজের সঙ্গে যোগ রেখে সচেতনভাবে গড়ে তোলা অফস্ক্রীন ইমেজের যোগ্য মেলবন্ধনেই এটা সম্ভব হয়েছে। যেমন প্রথমে আমির খানের কথাই ধরা যাক, তিনখানের মধ্যে ইনিই সবচেয়ে ‘এক্সক্লুসিভ’ এবং ‘এলিট’ বলে খ্যাত। ‘এলিট’ শব্দটা যদি আমিরের দর্শককুলের জন্য প্রযোজ্য হয়, তাহলে ‘এক্সক্লুসিভ’ শব্দটা অতি অবশ্যই তাঁর ছবির বিষয়-রোল-লুক নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার জন্য। ‘মঙ্গল পাণ্ডে দ্য রাইজিং’, ‘রং দে বাসন্তী’, ‘তারে জমিন পার’, ‘থ্রী ইডিয়টস’ বা ‘পিকে’- আমির নিজের চরিত্র নিয়ে যেমন পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেই চলেছেন, ঠিক সেরকমই চরিত্রের জন্য ছাত্রের মতো ধৈর্য ও অধ্যাবসায় নিয়ে নিজেকে তৈরি করারও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনখানের মধ্যে সবচেয়ে কম ছবি করা আমিরের প্রতিটি ছবিতে সামাজিক কিছু বার্তা থাকা মাস্ট। এবং ভরপুর বিনোদনের মধ্যেও কীভাবে সুশীল নাগরিক বা দায়িত্বশীল সমাজকর্মীর ভূমিকা পালন করা যায়, তা আমির সব সিনেমাতেই দেখিয়েছেন। আমিরের জনপ্রিয় টিভি শো ‘সত্যমেব জয়তে’ও আমিরের এই সমাজসচেতন জনমুখী ইমেজ গড়ে তুলেছে সারা ভারতে, এমনকী বিভিন্ন সামাজিক ঘটনায় আমিরের অংশগ্রহণ বা প্রতিক্রিয়াও আমিরের একটি নির্দিষ্ট ‘ব্র্যান্ড’ গড়ে তুলেছে, যে ব্র্যান্ড অবশ্যই তাঁর বক্স অফিসে প্রভাব ফেলেছে।

সলমন ব্র্যান্ড কিন্তু আমিরের মতো ‘এলিট’ নয়, তা একেবারে সাধারণ সবশ্রেণীর মানুষের জন্য। সলমনের ছবি মানেই সেটি ঈদের দিন মুক্তি পাবে, এবং হলের সামনে গাঁদাফুলের বিশাল বিশাল মালায় ঢাকা থাকবে ‘সল্লুভাই’-এর বড়মাপের বিলবোর্ড, শহরতলি এবং গ্রামের হলগুলিতে অবশ্যই কমকরে টানা কয়েকসপ্তাহ হাউসফুল বোর্ড ঝুলবে। এবং ছবিতে সলমনের ভূমিকা প্রায় দেবতার সমান, অর্থাৎ তিনি দুষ্টেরsrk-amir দমনে যেমন সবার আগে, তেমন শিষ্টের পালনেও কম যান না। দক্ষিণের রজনীকান্তের প্রায় উত্তরায়ন ঘটে সলমনের চরিত্রগুলিতে। এবং এই ‘দেবতার মতো মানুষ’-এর ব্র্যান্ডটাই হল ‘ব্র্যান্ড সলমন’, যে ব্র্যান্ডের খাতিরে ফৌজদারী মামলায় সল্লুর শাস্তির খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা দেশ। ব্র্যান্ডের এমনই মহিমা!

শাহরুখের ব্র্যান্ড আপাদমস্তক রোম্যান্টিক নায়কের। সেই নব্বই দশকের ডিডিএলজে-এর রাজ এখন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই তিনসন্তানের বাবা, তবু তিনি আজও ‘দিলওয়ালে’, আজও অনুষ্কা শর্মা থেকে দীপিকা পাড়ুকোন- একুশ বছরের নবাগত নায়িকার ডেব্যু হয় তাঁর বিপরীতে। এবং যতই বয়সে নবীন, প্রায় তাঁর পুত্রসম রোম্যান্টিক নায়কেরা আসুন বলিপাড়ায়, প্রেমে-রোম্যান্সে এসআরকে-র কোনও বিকল্প এখনও নেই এখানে। ভারতের বাইরে ভারতীয় সিনেমা বলতে শুধু ‘ডিডিএলজে’ এবং ‘দেবদাস’ কে বোঝে একটা বড় পৃথিবী। এবং আজও কিং খানের ছবি মুক্তি মানে ভারতীয় তরুণীদের ভ্যালেন্টাইন্স ডে।

তাই ভারতীয় সিনেমার খানদানি অধ্যায়ে ‘ব্র্যান্ড’-ই শেষ পরিচয়।