পোশাকে বলি-পাড়ার বিবর্তন

2459

kinkiniভারতীয় সিনেমায় পোশাক-আশাক নিয়ে যে পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে, তা মূলত ভারতীয় সমাজমানসের পরিবর্তন ও আধুনিকতারই উদাহরণ। একটা সময় ছিল যখন মূলত খোলামেলা সাহসী পোশাকের জন্যই পর্দায় আইটেম ডান্সারদের আনা শুরু হল। কিন্তু এখন সংস্কার ও ছুঁৎমার্গ সেভাবে আর না থাকায় হেলেনের মতো ‘আইটেম ডান্সার’দের আলাদা একটা শ্রেণি আর নেই। ঐশ্বর্য থেকে ক্যাটরিনা কিংবা করিনা- বলিউডের প্রথমসারির সব নায়িকাই আইটেম নাম্বারের সঙ্গে নাচছেন। খোলামেলা পোশাকে নায়িকারা এখন যথেষ্ট সাবলীল, এমনকী পর্দায় বিকিনি পরেও দেখা যাচ্ছে তাঁদের। কিন্তু একেবারে প্রথমে বলিউড বা টলিউডের সিনেমার নায়িকাদের পোশাক কেমন ছিল?  ফিরে দেখলেন কিঙ্কিণী বন্দ্যোপাধ্যায়

exposed blouseতখনকার সাদাকালো সিনেমার শহরের নাম ‘মুম্বই’ হয়নি, ছিল বম্বে। ১৯০৯ সালে এই যে বলিউডের যাত্রা শুরু, তার চলচ্চিত্র শিল্প সমৃদ্ধ হয়ে উঠল আরো বছর কুড়ি পরে, ১৯৩০ সাল নাগাদ। কেমন ছিল ১৯৩০ সালের নায়িকাদের পোশাক? তখনকার সাদাকালো সিনেমায় একবার ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই সেইসময়ের বিখ্যাত দুই নায়িকা দেবিকারানি ও কাননদেবীকে। শুধু বলিউড নয়, কলকাতার মেয়ে কাননদেবী সমানে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বাংলা সিনেমার পর্দাও। অভিনয়ের পাশাপাশি সুকণ্ঠী গায়িকাও ছিলেন তিনি। এই দুই বিখ্যাত সুন্দরী নায়িকার সঙ্গে আরেক গায়িকা-অভিনেত্রী যমুনা বড়ুয়ার নামও করতেই হয়। পর্দায় তাঁদের সাজ ছিল একেবারেই সাদামাটা। চুলে পাতা কেটে সিঁথি করে পরিপাটি করে চেপে চুল আঁচড়ানো, অবাধ্য চুল কানের পাশ থেকে প্রায় উঁকি মারে না। নায়িকারা সবাই শাড়ি পরতেন। কাননদেবী- যমুনা বড়ুয়ার ব্লাউজের গলায় অনেক সময়েই ছোটো-বড় কুঁচি দেওয়া থাকত। সামান্য ঢিলা হাতার ব্লাউজের উপরদিয়ে ভালো করে শাড়ি জড়ানো। খুব ঢেকেঢুকে শাড়ি পরড় এই ধরনটা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। অনেকসময়েই দেখা যায় আঁচলটাকেও আবার গলার উপর দিয়ে ফিরিয়ে এনে গায়ে ঢাকা দেওয়া হয়েছে, এমনকী মাথার খোঁপার উপরেও আলগা ঘোমটা দিতে দেখা যেত নায়িকাদেরও! গয়নাগাটির তেমন বাহুল্য খুব বেশী দেখা যেত না।

সত্তরের সময় থেকে রেখা, হেমা মালিনী, জয়া বচ্চন, তনুজা শাড়ি-সালওয়ার-ট্রাউজার ছাড়াও স্কার্ট বা ড্রেসে পর্দায় আসতে থাকলেন। ছিলেন স্লিভলেস ব্লাউজের আশা পারখ, মিনিস্কার্টের জিনাত আমন।

141329661690s-bollywood-sarees১৯৪০ নাগাদ পোশাক হয়ে উঠল দৃষ্টিনন্দন, এতদিন কোনওরকমে শাড়ি জড়িয়ে মুড়ে রাখার যে ব্যাপার ছিল তার থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক ভঙ্গীতে শাড়ি পরলেন নায়িকারা। গলায় হাতে কুঁচি দেওয়া ব্লাউজের বদলে চৌকো গলা ছোটো হাতা ব্লাউজ পরতে লাগলেন নায়িকারা। ’৪০-র নূরজাহান বা ’৫০-র শ্যামা, নার্গিস, সুরাইয়াকে দেখা গেল শিফন শাড়িতে। এই স্মার্ট-শাড়ি ব্লাউজের নায়িকারা আঁচল ঘোমটা করে না পরে হাওয়ায় আঁচল ওড়াতেও দ্বিধা করেন না। ম্যাচিং শাড়ি-ব্লাউজের সঙ্গে কানে ঝোলা দুলও ছিল অ্যাকসেসরি। ’৬০ সালের আগেপরে থেকে নায়িকারা অনায়াসে সালওয়ার-কামিজ পরতে থাকলেন। নূতন-সায়রা বানু-বৈজয়ন্তী মালার পোশাক বৈচিত্র্যে সেজে উঠল। স্কিনফিটেড স্লিভলেস কামিজ ও টাইট চুড়িদার খুব পরিচিত পোশাক হয়ে উঠল। তবে নূতনের গলাবন্ধ ব্লাউজ, বৈজয়ন্তীমালা বা মীনাকুমারীর ঘাঘরা-চোলিও কম যায়না। এইসময় থেকে নায়িকারা এক্সপোজ করার ব্যাপারে রক্ষণশীলতা কাটিয়ে উঠলেন। মীনাকুমারী বা মালা সিনহাকে আংশিক এক্সপোজড শাড়ি বা ব্লাউজে দেখা গেল। এরপর অর্থাৎ ’৬০-র পর থেকে লম্বাঝুল টপের সঙ্গে স্কিনফিটেড স্ল্যাক্সও পরতে থাকলেন সায়রা বানু থেকে শর্মিলা ঠাকুর সবাই। চুল টেনে বুফোঁ খোঁপা এবং স্লিভলেস ব্লাউজে সাহসী শাড়ি আর সানগ্লাস ছিল এইসময়ের নায়িকাদের চলতি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। এমনকী নাচের দৃশ্যে ওড়না ছাড়াই ঘাঘরা চোলিতেও সাহসী হয়ে উঠতে লাগলেন অভিনেত্রীরা।

‘বম্বে ভেলভেট’, ‘গুন্ডে’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’ ইত্যাদি ছবির মাধ্যমে আবার রেট্রো লুক নিয়ে হচ্ছে পরীক্ষা-নীরিক্ষা।

zeenat-aman-sexy-in-red-and-green-sareeসত্তরের সময় থেকে রেখা, হেমা মালিনী, জয়া বচ্চন, তনুজা শাড়ি-সালওয়ার-ট্রাউজার ছাড়াও স্কার্ট বা ড্রেসে পর্দায় আসতে থাকলেন। ছিলেন স্লিভলেস ব্লাউজের আশা পারখ, মিনিস্কার্টের জিনাত আমন। যদিও শাড়ি পরা জয়া বা রেখার আবেদন তখনও ছিল। এরপর আশির দশকে মীনাক্ষি শেষাদ্রি, শ্রীদেবী, মাধুরী দীক্ষিত, মনীষা কৈরালা অনায়াসে চোলির সঙ্গে স্কার্ট বা প্যান্ট পরে পর্দা কাঁপিয়েছেন। জিন্স-টপ ছিল তখনকার নায়িকাদের চলতি পোশাক, তবে ফোরপিস ঢিলে রঙচঙে ওড়নাসহ পোশাক সেইসঙ্গে চুলে স্কার্ফ বেঁধে ফ্যাশনই ছিল তখন ট্রেন্ডি। নব্বইয়ের কাজল-জুহি-করিশ্মা-রানি-ঊর্মিলা পরতেন হাই ওয়েস্ট জিন্স, বক্সহীল জুতো, নটেড টপ, কখনও সখনও ফ্লোরাল ফ্রক-ড্রেসেও তাঁরা সাজতেন। বেলবটম প্যান্ট সত্তরের নায়ক নায়িকাদের পর আবার নব্বইতে ফিরে এল পর্দায়।

এরপরে ঐশ্বর্য-করিনাই হোক বা ক্যাটরিনা-অনুষ্কা পোশাকে সবাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়েছেন আধুনিক। শর্ট স্কার্ট-হট প্যান্ট ছাড়াও ফিল্মে অনেকসময়েই আমজনতার রোজকার পোশাকে সাজছেন নায়িকারা। সে ‘লাভ আজকাল’-এর দীপিকার কুর্তি-লেগিংসই হোক, বা ‘পিকে’ তে অনুষ্কার বয়কাট চুল আর লুজ টপ। এছাড়াও ‘বম্বে ভেলভেট’, ‘গুন্ডে’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’ ইত্যাদি ছবির মাধ্যমে আবার রেট্রো লুক নিয়ে হচ্ছে পরীক্ষা-নীরিক্ষা। দেখা যাক, ফ্যাশনের বিবর্তনে বলিউডের পর্দা আবার নতুন কী উপহার দেয়?anushka