আইকন উদ্যোগী বাঙালি

661

‘বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী’ প্রবাদটা থাকলেও বাঙালির মানসিকতায় যেন ফুটে ওঠে – বাঙালি লক্ষ্মী ভজনার বদলে বরং সরস্বতী আরাধনায় বেশি মগ্ন৷ কিন্তু বাঙালি ব্যবসা করে না এমনটা ভাবা ঠিক নয়৷ ইতিহাসের পাতা উল্টে বাঙালি উদ্যোগীদের কথা জানা যায়৷ বাণিজ্য পথ হিসেবে তাম্রলিপ্ত (অধুনা তমলুক) বন্দরের কথা প্রাচীন কাল থেকে শোনা যায়৷ অন্যদিকে লোককথায় মৃত স্বামী লখীন্দরের জীবন ফিরিয়ে আনার মধ্যে এক প্রতীক চরিত্র হয়ে উঠেছেন বেহুলা৷ এই বেহুলার শ্বশুর হলেন চম্পকনগরের বিখ্যাত বণিক চাঁদ সদাগর৷ তিনি বাঙালি ছিলেন বলেই লোককথায় কথিত৷ তবে এখন যে বাঙালি ব্যবসা করছে না, এমন তকমা দেওয়াটাও ঠিক নয়৷ তাই মনে হয় বরং বলা উচিত সব কিছুর উত্থান পতনের মতোই বঙ্গজীবনে ব্যবসার প্রতি আগ্রহ বাড়তে কমতে দেখা গিয়েছে৷ ফলে বিভিন্ন যুগেই ব্যবসার জগতে বাঙালি আইকন খুঁজে পাওয়া যায়৷

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়

আধুনিক যুগে বাঙালি উদ্যোগপতিদের কথা বলতে গেল প্রথমেই মনে পড়ে যায় দ্বারকানাথ ঠাকুরের কথা৷ রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা আসলে ছিলেন জমিদার৷ কিন্তু জমিদারির আয় থেকে বিনিয়োগ করতে থাকেন বিভিন্ন ব্যবসায়৷ ইংরেজ আমলে কোম্পানির নুন ও আফিং দফতরের দেওয়ান থাকাকালীন ব্যবসার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন তিনি৷ ১৮৩৪ সালে তিনি গড়ে তোলেন কার টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি৷ এই সংস্থার বিনিয়োগে পরিমাণ ছিল সে সময় প্রায় ১০ লক্ষ টাকা৷ দেশে জাহাজ চালানোর ক্ষেত্রে পথিকৃত ছিল এই সংস্থাই – গড়া হয়েছিল দি জেনারেল স্টিম নেভিগেশন৷ একইসঙ্গে দ্বারকানাথ লগ্নি করেছিলেন চিনি-রেশম-নীলের ব্যবসায়৷ তাছাড়া কিছু ইউরোপীয়ান বন্ধুদের নিয়ে ১৮২৯ সালে গড়েছিলেন ইউনিয়ন ব্যাংক, যার মূলধন ছিল ১৫ লক্ষ টাকা৷ এছাড়া ১৮৩৭ সালে রাণীগঞ্জের কাছে চিনাকুরিতে কয়লা খনি কিনেছিলেন ৭০ হাজার টাকায়৷ ১৮৪৩ সালে গিলমোর-হামফ্রে কোম্পানির সঙ্গে এক যোগে গড়ে তোলেন বেঙ্গল কোল কোম্পানি৷ তবে সে সময়ের আরও কয়েকজন বাঙালি উদ্যোগপতিদের মধ্যে রয়েছেন রামদুলাল দে, মতিলাল শীল প্রমুখ৷

বাঙালির ব্যবসার কথা বলতে গেলে এসে পড়বেই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কথা৷ তিনিই প্রথম অনুভব করেছিলেন কৃষি নির্ভর ও চাকরি নির্ভর হয়ে বাঙালিকে বসে থাকলে চলবে না৷ তাঁর মতে, একটি জাতিকে স্বাবলম্বী হতে হলে দেশিয় উপকরণের উপর নির্ভর করে শিল্পমুখী হতে হবে৷ একজন নিজে বেঁচে তাঁর কারখানায় কাজ দিয়ে আর পাঁচজনকে বাঁচাতে সাহায্য করবে ৷

দ্বারকানাথ ঠাকুর
দ্বারকানাথ ঠাকুর

দেশে স্বদেশী রসায়ন শিল্প গড়ে তুললে তার যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে তা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন তিনি৷ তাই ১৮৭০ সালে মাত্র ৭০০ টাকা সম্বল করে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যালস ওয়ার্কস৷ ব্রিটিশ সরকারের তাচ্ছিল্য আর দেশি বিদেশি চিকিৎসকদের অসহযোগিতা উপেক্ষা করেই এগিয়েছিলেন তিনি ৷ ফলে ১৯০১ সালে ২৩,৩৭১ টাকা মূলধন নিয়ে বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কস লিমিটেড নামে আত্মপ্রকাশ করে আর ১৯১৫ সালে সেই মূলধন চারলক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায় ৷ বেঙ্গল কেমিক্যালসের পাশাপাশি আচার্যের সহযোগিতায় লাভ করেছিল আরও বেশ কয়েকটি দেশিয় প্রতিষ্ঠান৷ যাদের মধ্যে ছিল বেঙ্গল পটারিজ, বেঙ্গল এনামেল, ক্যালকাটা সোপ ওয়ার্কস, ন্যাশনাল ট্যানারিজ মার্কেনন্টাইল মেরিন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য৷
এই প্রজন্মের বাঙালিও ব্যবসা করছে দেশে বিদেশে৷ ফলে মনে পড়ে যাচ্ছে পিয়ারলেস গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি রায় থেকে দি চ্যাটার্জি গোষ্ঠীর চেয়াম্যান পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় নাম ৷ আবার রয়েছেন চা শিল্প জগতে নয়নতারা পালচৌধুরি এবং ডিসিপিএলের কর্ণধার শান্তা ঘোষের মতো মহিলা উদ্যোগপতির উদাহরণ৷ তাছাড়া মনে রাখা দরকার জাতীয় বণিকসভা সিআইআই-এর বর্তমান সভাপতি হয়েছেন সুমিত মজুমদার, এই বঙ্গসন্তান হলেন টিআইএল লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যান্ড ম্যানেজিং ডিরেক্টর৷ তবে এটাও ঠিক সম্প্রতি বাঙালি শিল্পপতি হিসেবে বিশেষ আলোচিত নাম হল চন্দ্রশেখর ঘোষ৷ ২৩ আগস্ট তাঁরই প্রতিষ্ঠিত বন্ধন ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ঘটনাচক্রে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজ্যে এই প্রথম কোনও ব্যাংক তৈরি হতে চলেছে ৷ শুধু তাই নয় গত বছর অম্বানি, বিড়লা, বাজাজ সহ ২৫টি শিল্পগোষ্ঠী যখন ব্যাংক গড়ার দৌড়ে নেমে রিজার্ভ ব্যাংকের দরজায় কড়া নাড়ছিল তখন মাত্র দু’টি সংস্থাকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল৷ তার মধ্য অন্যতম অবশ্যই মাইক্রোফিনান্সে বন্ধন ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা বাঙালি চন্দ্রশেখর ৷