পঞ্চাশের পঞ্চপ্রাপ্তি

1112

ভারত ১৯৫০-এর ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলেও ব্রাজিল যাত্রা আর শেষ পর্যন্ত হয়নি। ‘মিথ’ আছে বুট না পরে খেলার জন্য নাকি ফিফা ভারতকে খেলার অনুমতি দেয়নি, এছাড়া প্রস্তুতির জন্য পর্জাপ্ত সময় এবং ব্রাজিল পাঠানোর বিপুল অর্থ ব্যয় নাকি সম্ভব ছিল না।

সায়ম কোানর
সায়ম কোনার

দুঃখের বিষয় এই যে এর মধ্যে কোন কথাই ঠিক সত্যি নয়। ফিফা যে কোন মূল্যে এশিয়ার একটি প্রতিনিধি বিশ্বকাপে চেয়েছিল, এবং সেই কারণে সব রকম সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিল। এমনকী অংশগ্রহণের জন্য যাবতীয় খরচের অনেকটাই বহন করতেও তারা রাজি হয়েছিল। এদিকে বুট পরে খেলার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ও যথেষ্টই ছিল। আসলে শাক দিয়ে চুনোপুঁটি ঢাকা গেলেও আস্ত তিমি মাছ ঢাকা তো সম্ভব না। আসল কারণ অদূরদর্শী প্রশাসকরা জুলে রিমে ট্রফির চেয়ে অলিম্পিককে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন । বিশ্বকাপ খেলে বিশেষ লাভ নেই, এটাই ছিল তাঁদের ধারণা । পরে যখন নিজেদের ভুলের বিশালত্ব তাঁরা বোঝেন তখন আর পাঁচটা দক্ষ রাজনীত…ইয়ে…মিথ্যেবাদীর মত মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হন। কিন্তু যদি ভারত সত্যি ব্রাজিল যেত (‘যদি’ ভেবে বিশেষ লাভ নেই জানি, তবু ভারতকে বিশ্বকাপ খেলাতে হলে তো স্বপ্নের আশ্রয় নিতেই হয়), তাহলে কি হতে পারত একটু কল্পনা করা যাক।

১৯৫০ এর কুখ্যাত ‘মারাকানাজো’র কথা অনেকেই হয়ত জানতে পারেন। যেটা দুর্ভাগ্যবশত খুব কম জন জানেন, তা হল এই বিশ্বকাপেই বিশ্ববাসী শৈলেন মান্না, সাহু মেওয়ালাল, তাজ মহম্মদ, নূর মহম্মদের মত প্রতিভা স্বচক্ষে দেখতে পারত। জানতে পারত কিংবদন্তি সৈয়দ আব্দুল রহিমের মতো একজন কোচকে, যাঁর কিছু কীর্তির কথায় একটু পরে আসছি। আর কিছু না হোক, তখনকার এশিয়ার সেরা ফুটবলাররা যে অন্তত বিশ্ব দরবারে প্রশংসা কুড়াত এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণ, এমন বিশ্বমানের প্রতিভার বিকাশের জন্য বিশ্বকাপ একেবারে আদর্শ মঞ্চ ছিল। ফুটবলে কোনও দিন পা না দেওয়া কিছু সবজান্তার অপেশাদার, অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য ১২০ কোটি মানুষকে ৬৫ বছর পরেও হাত কামড়াতে হত না, ও দেশের জন্য বহু ঘাম, রক্ত ঝরানো নায়কদের বিশাল,বিশ-আল এই আক্ষেপ নিয়ে চোখ বুজতে হত না।

রহিম-কথা

সৈয়দ আবদুল রহিম: ১৯৫০ সালে ভারতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে ১৯৬৩ সালে নিজের মৃত্যু অবধি নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাঁধে বয়ে যান ভারতীয় ফুটবলকে। তাঁর মৃত্যুর পর ভারতীয় দলের কোচ হন আলবের্তো ফার্নান্দো, যিনি ব্রাজিলে এক ওয়ার্কশপ থেকে ফিরে বলেছিলেন “What I learnt from Rahim in 1956 is being taught now in Brazil. Verily, he was a football prophet.

50প্রসঙ্গত, রহিম সাহেবের হাত ধরে ভারতীয় ফুটবলের এক মহান কীর্তির কথা বলি। ১৯৬২ জাকার্তা এশিয়াডে ভারতের শেফ-দ্য-মিশন গুরু দত্ত সোঁধির বিতর্কিত কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য শুরু থেকেই ভারতীয় অ্যাথলিটদের ইন্দোনেশিয়ায় ব্যারাকিংয়ের সামনে পড়তে হয়। খেলোয়াড়দের উপর রীতিমতো আক্রমণ অবধি করা হয়! ফুটবল দল এর মধ্যে প্রথম ম্যাচ দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ২-০ হেরে শুরু করে। তবে রহিম সাব ঠিক গুছিয়ে নেন নিজের দলকে। গ্রুপের বাকি ম্যাচে জাপান ও তাইল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে হারিয়ে ভারত ফাইনালে ওঠে। ফাইনাল ছিল এশিয়াডের শেষ ইভেন্ট এবং লক্ষাধিক দর্শকের রোষের মুখে ভারত ফাইনালে নেমেছিল সেই দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধেই। কোরীয় দর্শকে ঠাসা সেনায়ন স্টেডিয়ামে ৪ঠা সেপ্টেম্বর ভারতীয় ফুটবল দল সমর্থন পেয়েছিল একমাত্র পাকিস্তানি হকি দলের থেকে(ওঁরা খেলোয়াড়…মিথ্যেব…ইয়ে…রাজনীতিক নন)! ফাইনালে নামার আগে রহিম সাহেব এক অতুলনীয় ভোকাল টনিক দিয়ে দলকে উদ্বুদ্ধ করেন। বলেন- দেখ, আজ লক্ষাধিক লোক বিপক্ষকে সমর্থন করতে পারে, তোমাদের উত্যক্ত করতে পারে, মায় ইট-পাটকেল ছুঁড়তে পারে। কিন্তু মনে রেখো, তোমরা জিতলে পোডিয়ামে উঠে সোনার মেডেলগুলি নিয়ে যখন জাতীয় সংগীত গাইবে, তখন কিন্তু এই মানুষগুলোকেই বাধ্য হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের ভারতবর্ষকে কুর্নিশ জানাতে হবে। কত সহজ কথা…অথচ কি প্রচন্ড দেশাত্মবোধক আবেগ! ফাইনালে কোরিয়া দাঁড়াতে পারেনি। স্কোরলাইন আপাতদৃষ্টিতে “হাড্ডাহাড্ডি” ২-১ হলেও ভারত প্রথম ২০ মিনিটেই কোরীয় রক্ষণকে ফালাফালা করে ২ গোল দিয়ে ম্যাচ পকেটে পুরে নেয়। সেই এককালের ‘উড়ে যাওয়া’ দক্ষিণ কোরীয়রাই একদিন বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলে ফেলল। আমরা স্রেফ তলিয়ে গেলাম। কে জানে, বিশ্বকাপ খেললেও হয়ত ঠিক এমনভাবেই রহিম সাহেব তাঁর ছেলেদের নিয়ে আরেক সোনালী গৌরবগাথা লিখতে পারতেন! কিন্তু সুযোগ আর পেলেন কই? এরই সাথে বলে রাখা ভালো, ১৯৫১ সালে, অর্থাৎ ব্রাজিল বিশ্বকাপের ঠিক পরের বছরই ভারত প্রথম এশিয়াডে ফুটবলে সোনা পেয়েছিল সৈয়দ আবদুল রহিমের হাত ধরেই। রহিম সাহেবকে ছেড়ে ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস অসম্পূর্ণ।

chuniএবার বিশ্বকাপে ফেরা যাক। ভারতের গ্রুপে থাকার কথা ছিল সুইডেন, ইতালি ও প্যারাগুয়ের। যদি প্র্যাকটিক্যালি ভাবা যায়, এই গ্রুপ থেকে প্রথম হয়ে ফাইনাল রাউন্ডে ওঠাটা খুব কঠিন হলেও একেবারে অসম্ভব ছিল না। প্যারাগুয়ে ধারে-ভারে ভারতের থেকে হয়তো কিছুটা পিছিয়েই ছিল সেই সময়। ইতালি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন (১৯৩৪ ও ১৯৩৮ এ ইতালি বিশ্বকাপ জেতার পর ১৯৪২, ১৯৪৬ বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপ হয়নি) হলেও ১৯৪৯-এ এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় জাতীয় দলের প্রায় সব খেলোয়াড় প্রাণ হারান। তাই নিতান্তই ভাঙা দল নিয়ে তারা জাহাজে ব্রাজিল পৌঁছয়। সুইডেনকে হারানো হয়তো একটু বেশিই কঠিন হত, তবে অঘটন ঘটানোর রসদ কিন্তু সেই সময়কার ভারতীয় দলের যথেষ্ট ছিল। কে জানে! ফাইনাল রাউন্ডে ওঠার কথা না হয় বাদ দিলাম, তবু বিশ্বকাপে একটি জয়ও খুব কম কৃতিত্বের কিছু হত কী? সে জায়গায় আজ আমরা বিশ্বে তো বটেই, এশীয় ফুটবলের মানচিত্রেও নিতান্তই লাস্টবয়ের সমকক্ষ। তবে রাজনীত…ইয়ে…মিথ্যেব…ধুত্তোর…প্রশাসক…হ্যাঁ প্রশাসকদের তাতে কী যায় আসে? ওনারা ফুটবলটা একটু বেশিই বুঝতেন কি না!

শুরুতেই মারাকানাজোর কথা বলেছিলাম। মারাকানা স্টেডিয়ামে ১৯৫০-এর ১৬ জুলাই ব্রাজিল-উরুগুয়ের মধ্যে খেলাটি কিন্তু আক্ষরিক অর্থে ফাইনাল ছিল না। চারটি গ্রুপ থেকে যে ৪টি দল শেষ রাউন্ডে ওঠে তাদের মধ্যে লিগ ফরম্যাটে ম্যাচ হয়। এই লিগেরই শেষ ম্যাচ ছিল ব্রাজিল-উরুগুয়ে। ব্রাজিলের শুধু ড্র প্রয়োজন ছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে! প্রায় ২ লক্ষ সমর্থকের সামনে ১ গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ অব্দি হেরে যায় ব্রাজিল, এবং উরুগুয়ে ১৯৩০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হয়। এই অবধি তো ইতিহাস। তা ভারত খেললে এবং কোনও প্রকারে ফাইনাল রাউন্ডে উঠে গেলে এমন তো হতেই পারত যে, ব্রাজিল বা উরুগুয়ে মারাকানার ম্যাচের আগেই হয়তো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত? মারাকানাজো হয়তো হতই না? ফুটবলের ইতিহাস অন্যভাবে হয়তো লিখতে হত স্রেফ ভারতের জন্য? ভারত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হত কি না সেদিকে যাচ্ছিই না, শুধু যদি দু-একটি অঘটন ঘটিয়ে দিত, ফুটবলের চিত্রনাট্যই হয়ত বদলে যেত।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলি। যদি ভারত সত্যি বিশ্বকাপ খেলত, তাহলে জঘন্যভাবে কম্পাইল করা এই লেখাটা লিখতে হত না, এবং যাঁরা অসীম কৃপা করে আকাশকুসুম ভাবনার এই প্রবন্ধটা এতক্ষণ সময় ব্যয় করে পড়লেন (তাঁরা দেশপ্রেমী, ফুটবলপ্রেমী বা ব্যক্তিগতভাবে আমার চেনা মানুষ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই!), তাঁদের আমি গ্যারান্টি সহকারে বলতে পারি, ৯০% মানুষ দ্বিতীয় কি তৃতীয় প্যারাগ্রাফের বেশি এগননি। আপনারা যতজন এই লাইনটি অবধি পড়লেন, তার চেয়ে হয়তো অনেক বেশি মানুষ ২০১৮-এ রাশিয়ায় বিশ্বকাপ খেলবেন। সুতরাং ভারত ১৯৫০ বিশ্বকাপ না খেলার জন্য আপনি এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অতিবিরল শ্রেণির এক মানুষের দলে নাম লেখালেন! আপনারা সত্যি ভাগ্যবান! অনেক অনেক অভিনন্দন আপনাদের! ধন্যবাদ না দিলেও চলবে!

-সায়ম কোনার