রেকর্ড ব্যবসা করলেও জুরাসিক ওয়ার্ল্ড দেখে মন ভরল কি?

2055

গত সপ্তাহেই মুক্তি পেয়েছে জুরাসিক পার্ক সিরিজের চতুর্থ সিনেমা জুরাসিক ওয়ার্ল্ড। আর সেই সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা ক্যাম্পাসের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন হলিউড সায়েন্স ফিকশন মুভি বাফ সঞ্চারি চক্রবর্তী।  sanchari

প্রথমেই বলি এই লেখা ঠিক তথাকথিত ফিল্ম রিভিউ নয় এমনকী ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’কে এক থেকে দশের মধ্যে স্কোরিং করাও আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আসলে জুরাসিক সিরিজের সিনেমা মানেই নস্টালজিয়া। ছোটবেলায় দেখা ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার আবেদন বড় হয়েও একটুও ম্লান হয়নি আমার কাছে। সায়েন্স ফিকশন আমার বরাবরই ভালো লাগে। আর সেই ফিকশনের বিষয় যদি হয় ডাইনোসর বা কিং কং, তাহলে তো আমি দেখবই।

তাই ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ মুক্তি পাওয়া মাত্রই হলে ছুটে গেছি ছবিটা দেখতে , এবং অবশ্যই থ্রিডিতে দেখেছি। কারণ, ১৫০ মিলিয়ন বাজেটের এই সিনেমার এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসরের নাম যে স্টিভেন স্পিলবার্গ! আলো আর প্রযুক্তির কারিকুরিতে চোখের সামনে ‘ইনডমিনাস রেক্স’কে জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখব না? তাই দেরি না করে চোখে থ্রিডি চশমা লাগিয়ে দেখতে বসলাম জুরাসিক ওয়ার্ল্ড।

এখানে এই সিনেমার মুক্তি পাওয়ার নেপথ্যের জমজমাট নাটক নিয়ে কয়েকটা কথা না বললেই নয়, কারণ সেই ঘটনাও সমান রোহমর্ষক। জানেন তো, জুরাসিক পার্কের চতুর্থ এই খন্ডটি দেখতে আমাদের এত দেরি হওয়ার কথাই নয়। কারণ, সেই ২০০১ সালে জুরাসিক পার্ক ৩-এর এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার স্পিলবার্গ ফাঁস করেছিলেন এই সিরিজের চতুর্থ সিনেমা আসতে চলেছে। যদিও সে সময় সিরিজের ৩ নম্বর সিনেমার পরিচালক জোন জনস্টন সে দাবি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমনকী, জনস্টন সে সময় বলেছিলেন যে তিনি আর কোনও সিনেমাই পরিচালনা করবেন না। যাই হোক, ২০০২ সালের ৭-ই নভেম্বর এই সিনেমার স্ক্রিনরাইটার হিসেবে উইলিয়াম মোনাহানের নাম ঘোষণা হয়। সে বছরই ঠিক হয় সিনেমাটি প্রযোজনা করবেন ক্যাথলিন কেনেডি, স্পিলবার্গ থাকবেন এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে। এক মাস পরে ঘোষণা করে দেওয়া হল ২০০৫ সালের গ্রীষ্মে সিনেমাটি মু্ক্তি পাবে। j-5

তারপরের গল্প সাংঘাতিক। একের পর ফিল্মের কলাকুশলীরা স্পিলবার্গের সঙ্গে ঝামেলার জেরে কাজ কাজ ছেড়ে দিতে থাকেন এবং সেই কারণে সিনেমার রিলিজ পিছতে থাকে। একে একে সরে যান সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার, প্রযোজকেরা। হতাশ হয়ে পড়েন স্পিলবার্গ। নায়ক-নায়িকা কে হবেন তাই নিয়ে হলিউডের অন্দরেই শুরু যায় সমস্যা। একাধিক ব্যক্তিরা দাবি করতে থাকেন, “আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল সিনেমাটিতে অভিনয় করার জন্য। কিন্তু তারপরে আর কথা এগোয়নি’’ -এই বলে। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ঝামেলা শুরু হওয়ার দশ বছর পর, ২০১২ সালের ২১ জুন স্পিলবার্গ ঘোষণা করেন, তিনি এই সিনেমা পরিচালনা করবেন না, বরং প্রযোজনা করবেন।

২০১৩ সালে শুরু হয় প্রি প্রোডাকশনের কাজ। তখনই ইউনিভার্সাল সিনেমা ঘোষণা করে দেয় সিনেমার নাম হবে জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ও সিনেমাটি থ্রিডিতে শ্যুট করা হবে। ২০১৪ সালে জুন মাসের ১৩ তারিখ মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। তখনও পরিচালকের নাম নিয়ে চলছে দড়ি টানাটানি। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের ১৪ই মার্চ পরিচালক হিসেবে কলিন ট্রেভর-এরও নাম ঘোষণা করে। এর আগে কলিন ‘সেফটি নট গ্যারেন্টেড’-এর মতো কম বাজেটের হলিউডি ছবি পরিচালনা করেছিলেন এবং প্রযোজক হিসেবে চূড়ান্ত হয় প্যাট্রিক ক্রাউলির নাম।

ফের শুরু হয় সমস্যা। আগের স্ক্রিপ্ট রাইটারদের লেখা মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না নয়া পরিচালকের। তাই আমূল বদলে গেল স্ক্রিপ্ট। নয়া স্ক্রিপ্ট লিখতে বসলেন রিক জাফা ও অ্যামান্ডা সিলভা। ঠিক হল নায়ক হবেন ক্রিস প্যাট। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের জুনে মুক্তি পেল জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের ট্রেলার। তারপরেও বাধা বিপত্তি কম আসেনি। শেষে চলতি বছরের ১২ জুন মুক্তি পেল আমার প্রিয় সিনেমাটি।J-1

এই তো গেল ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’-এর অন্দরের গপ্পো। এবার সিনেমা কেমন দেখলাম সে কথায় আসা যাক। সিনেমার গল্পে সেভাবে খুব চমকে ওঠার মতো অবকাশ নেই। সিনেমা শুরু হয় জ্যাশ ও গ্রে মিশেল এই দুই ভাইকে নিয়ে। এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে, জুরাসিক পার্ক গড়ে ওঠার ২২ বছর পর এখন ডাইনোসর থিমের এই পার্কে ভিড় লেগেই থাকে। ইন জেন সংস্থার নিয়ন্ত্রিত ইসলা নিউবলারে দ্বীপে ডাইনোসরদের সঙ্গে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আশ্চর্য সহাবস্থান। পার্কের অপারেশন ম্যানেজাররূপী নায়িকা ক্লেরা ডিরারিংয়ের( ব্রাইস ডলাস হোয়ার্ড) কাছে জ্যাশ ও গ্রে বেড়াতে আসে , ডাইনোসর পার্কের প্রতি আকাশছোঁয়া কৌতুহল নিয়ে। দাদা কদিন পরেই কলেজে পড়তে চলে যাবে, ছোট ভাইয়ের তাই মন খারাপ। এই সিকোয়েন্সে দুই ভাইয়ের আলাদা হয়ে যাওয়ার মুহূর্তের আবেগ সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। যাই হোক, দুই ভাই ডাইনোসর থিম পার্কে বেড়াতে গেলেও তাদের পিসি ক্লেয়ার কিন্তু ব্যস্ততার জন্য বিশেষ সময় দিতে পারে না, তাই তাদের পার্ক ঘোরানোর দায়িত্ব বর্তায় পিসির অধস্তনের উপর। পার্কে আরও বড় ডাইনোসর এনে ভিজিটরদের ভিড় বাড়ানোর দায়িত্ব ক্লেরার উপর। তাকে বলা হয়েছে , পার্কে এমন ভয়ংকর ডাইনোসর বানাতে হবে, যাতে পার্কে বেড়াতে আসা দর্শকেরা ভয়ে চমকে ওঠেন। তাতেই নাকি পার্কে ভিড় বাড়বে, ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠবে।

পার্কের চিফ জেনেটিসিস্ট ডাক্তার হেনরি য়ু বিভিন্ন ডাইনোসর ও সরিসৃপের ডিএনএ মিশিয়ে এক ভয়ঙ্কর ডাইনোর যার পোশাকি নাম ইনডমিনাস রেক্স বানাতে মগ্ন। পুরো কাজটাই চলছে গোপনে। পার্কের মালিক সাইমন মাসরানি( ইরফান খান) মোটেও জানেন না সে কথা। তিনি জানেন, ইনডমিনাস রেক্স নামে এক নয়া ডাইনোসরকে কদিন পরেই দর্শকদের সামনে দেখানো হবে। তার আগে পার্কের নিরাপত্তা নিশ্চিৎ করতে ডাইনোসরদের এক ট্রেনারকে এনে নিশ্চিন্ত হতে চান। এখানেই আবির্ভাব নায়ক আওয়েন গ্র্যাডির(ক্রিস প্যাট)।

হিংস্র ডাইনোদের গুলি-বিদ্যুতের চাবুকে নয়, মনঃসংযোগের সাহায্যে বশ করে ফেলেন নায়ক, যা খানিকটা হিপনোটাইজেশনের মতো। গ্র্যাডির কর্মশালায় এক অধস্তন আচমকাই ডাইনোসরদের সামনে পড়ে যায়, তাকে ডাইনোদের মুখ থেকে বার করে আনতে প্রাণ বাজি রাখতে পারেন আওয়েন, তবু ডাইনোসরদের উপর গুলি চালাতে দেবেন না। এই আওয়েনকে পার্কে নিয়ে আসে ক্লেয়ার। জানা যায়, তাদের মধ্যে একসময় প্রেমের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু ক্লেরার ডমিনেটিং স্বভাবের জন্য সেই সম্পর্ক পোক্ত হয়নি।

এদিকে ইন জেন সংস্থার নিরাপত্তা প্রধান ভিক হসকিন্স চান চার ভেলোকিরেপটর প্রজাতির ডাইনোসরদের মিলিটারি ট্রেনিংয়ে ব্যবহার করতে। যাতে মানুষের বদলে তারাই যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে শত্রুদের নিকেশ করে আসতে পারে। অতঃপর জুরাসিক পার্কে নায়কের প্রবেশ। ক্লেরা ও আওয়েন ইনডমিনাসের খাঁচা মজবুতি পরীক্ষা করতে আসেন। কিন্তু হিংস্র প্রজাতির সেই ডাইনোসরকে দেখতে পাওয়া যায় না, বদলে পাওয়া যায় খাঁচার দেয়ালে আঁচড়ের দাগ। তাহলে কী পালানোর চেষ্টা করেছিল ইনডমিনাস? সেটা মোটেও আশ্চর্যের নয়, কারণ, তার মাথায় অসম্ভব বুদ্ধি ইমপ্ল্যান্ট করা হয়েছে। গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে পারে এই ডাইনো। গায়ের চামড়ে বুলেটপ্রুফের মতো মোটা। দাঁতের কামড়ে আস্ত একটা গাছের গুঁড়ি দেশলাইয়ের মতো ভেঙে যায়। আওয়েন ও ক্লেরা ছুটলেন পাগলের মতো, কিন্তু ডাইনো মোটেও পালায়নি, সে লুকিয়ে ছিল মাত্র। খাঁচার দরজা খোলামাত্র নিরাপত্তরক্ষীদের ঘায়েল করে ছুট লাগায় সে। আওয়েন ও ক্লেরা তার পিছু নিতে গিয়ে দেখে পালানোর পথে একের পর এক অ্যাপ্টোসারাস ডাইনোসরদের নিকেশ করেছে রেক্স। পার্কের মালিক মাসরানি নিজে হেলিকপ্টার নিয়ে রেক্সের পিছু নিতে গিয়ে মারা যান। ইরফান খানের মতো শক্তিশালী অভিনেতার এই সিনেমায় করার বিশেষ কিছুই ছিল না। তাই সিনেমায় তাঁর মৃত্যুতে কাউকে শোক প্রকাশ করতে দেখা যায়নি, এমনকী সিনেমা হলে দর্শকরাও দুঃখ পাননি।j-4

ওদিকে পার্কে বেড়াতে আসা দু’ভাই অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় “জিরোস্ফিয়ার” নামে এক গোলাকৃতির গাড়িতে চেপে পার্ক দর্শনে বেড়িয়েছে। এই পার্ক কোনও সাধারণ চিড়িয়াখানার মতো নয়। হাজারো প্রকৃতির ডাইনোসরদের দেখতে এই পার্কে ভিড় জমান দর্শকরা। পার্কে বিনোদনের সব মশাল মজুত।পায়ে হেঁটে নয়, কোথাও গাড়ি চেপে, কোথাও মনোরেলে চেপে ডাইনো দর্শন করতে হয়। জলের উপরে ও জলের নিচে থাকা ডাইনোসরদের দেখার জন্য রিয়েল শো-এর বন্দোবস্ত রয়েছে। তা এহেন দু ভাই এবার পড়ল ইনডমিনাসের খপ্পরে। রেক্সের দাঁতের আঘাতে চুরমার হয়ে গেল জিরোস্ফিয়ার। যদিও প্রাণে বাঁচল দুই ভাইই।

নিরাপত্তা প্রধান হসকিন্স আঁচ করতে পারলেন পার্কে বিপদ আসন্ন। তাঁর পোষ্য ভেলোকিরেপটরসদের পাঠালেন ইনডমিনাস রেক্সের পিছু নিতে। আওয়েনও কয়েকজন সৈন্য নিয়ে রেক্সকে নিকেশ করতে বেরোয়। কিন্তু ইনডমিনাস রেক্স যে কী সাংঘাতিক ডাইনোসর, তার প্রমাণ মেলে এই দৃশ্যে। তাকে ধাওয়া করতে আসা ভেলোকিরেপটরসদের সঙ্গে কমিউনিকেট করে রেক্স। তাদের বুঝিয়ে উলটে আওয়েনের পিছনে লেলিয়ে দেয়। ব্যাস! আওয়েনের সঙ্গে আসা বন্দুকধারী সেনাদের ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতে দেরি করে না মাংসাশী ভেলোকিরেপটরসরা, যদিও এবারও প্রাণে বেঁচে যায় আওয়েন।

ওদিকে দু ভাই পার্কের ভিতর পায়ে হেঁটে ঘুরতে ঘুরেতে একটি খারাপ জিপ খুঁজে পায়। সৌভাগ্যক্রমে জিপটি চালু করা যায়। দুই ভাই জিপে চড়ে পালাতে থাকে। তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ক্লেরা ও আওয়েনের, ক্লেরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে তাই দেখে। ডাক্তার য়ু পরিস্থিতি আঁচ করে হেলিকপ্টারে চড়ে চম্পট দেন। যে ল্যাবে তিনি গোপনে রেক্সের মতো আরও ডাইনোসর বানাচ্ছিলেন সেখানে এক ডাইনোসরের হাতেও প্রাণ যায় হসকিন্সের।j-3

এবার খেল দেখানোর পালা আওয়েনের। তিনি নায়ক, সুতরাং ডাইনো তাঁর হাতে জব্দ হবে তা জানা কথা। র‍্যাপ্টরসদের লেলিয়ে দেয় রেক্সের পিছনে। রেক্সের সঙ্গে লড়াইয়ে দুই র‍্যাপ্টর মারাও যায়। ক্লেয়ারস এবার পার্কের খাঁচায় আটকে রাখা এক টির‍্যানোসরাস রেক্সকে ভিড়িয়ে দেয় ইনডমিনাসের বিরুদ্ধে। টির‍্যানোসরাসও ইনডমিনাসের কাছে হেরেই যেত যদি না পার্কের আর এক ডাইনোসর মোসাসরাস এসে রেক্সের ঘাড় কামড়ে ধরে জলের অতলে টেনে না নিয়ে যেত। তিন ডাইনোর এই লড়াই দেখতে দেখতে কখন যেন আমিও বেড়াতে চলে গেছি ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’-এ। ভয়ে মাঝে মধ্যে চেয়ারের হাতল ধরে বসতে হচ্ছিল কারণ মাঝেমাঝেই মনে হচ্ছিল স্ক্রীন থেকে চরিত্রগুলো যেন অডিয়েন্সে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।