প্রেমের প্যাঁচপয়জার অথবা যা ইচ্ছে তাই…

2303
barsha
বর্ষা মুখার্জী

‘তোমরা যা বলো তাই বলো, আমার লাগেনা মনে’ …হ্যাঁ, এতটাই নির্লজ্জ হতে হবে বস্৷ তা না হলে, এই স্মার্ট লাইফে শুধুই ডুগডুগি বাজিয়ে, অন্যের ছবির নিচে লিখে যেতে হবে, ‘রবনে বনা দি জোড়ি’ কিংবা ‘মেড ফর ইচ আদার’ গোত্রীয় কিছু বহু পুরোনো বস্তা-পচা শব্দগুচ্ছ৷ কবিগুরু এমন আশঙ্কা করে সেই কবেই কতরকমভাবে সাবধান বাণী শুনিয়ে গিয়েছেন…৷
‘আমার মন বলে, চাই চা ই, চাই গো—যারে নাহি পাই গো৷
সকল পাওয়ার মাঝে আমার মনে বেদন বাজে-
নাই, না ই নাই গো’ … হ্যাঁ, তাঁর কাছে আমরা সবক্ষেত্রেই আজীবন ঋণী৷ নাহ্, এবার খোলসা করে আসল কথাতেই আসা যাক৷
আসলে, আমাদের সম্পাদক মহাশয় বলেছেন(পড়তে হবে আদেশ!), পুজো স্পেশালে এবার চাই প্রেমের গল্প৷ প্রেম- সব বয়সে, সব ধরনের, সব ঋতুতে চলেবেল এক টপিক৷ ‘সীমার মাঝে অসীম’ একখানা বিষয়৷ তা বেশ৷ তাঁর কথা রাখতেই ঝাঁপ দিচ্ছি এই প্রেমসাগরে৷ সমুদ্র-মন্থনের মতো স্মৃতির সাগর হাতড়ে উঠে আসতে পারে যা কিছু৷ যার দায়, আর যারই হোক, আমার নয়৷
পুনশ্চ, শিরোনামেই রয়েছে তার আভাস৷
টুকরো টুকরো বিষাদময় স্মৃতি-কথা(অবশ্যই কিছুটা ভাবাবেগ তাড়িত), আর কিছু, শোনা গালগপ্পই শেয়ার করে নেবো তোমাদের সঙ্গে৷
একটা গোটা পৃথিবী, আমি আর প্রথম ক্রাশ- সে অনেক বছর আগের কথা৷ ‘আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়’…৷ পা রাখলুম ইউনিভার্সিটিতে৷ বেশ মনে পড়ছে ইউনিভার্সিটির চার নম্বর গেট টা কে৷ ভুলি কি করে৷ প্রেমের যাবতীয় পত্রপাঠ যে সেখানেই৷ তখনও অবশ্য জানি না, কোন খাতে বইবো৷ একব্যাগ ভয় আর বই, দুটোকেই বগলদাবা করে জয় বাবা লোকনাথ বলে ঢুকে পড়লাম৷ কে জানে কি আছে ভাগ্যে ভাবতে ভাবতেই শুরু হয়ে গেল এক অজানা পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পালা৷ ফিলিংস্ টা এমনই, যেন এলিয়েন ভার্সেস ইউনিভার্সিটি ৷ বিশ্বাস করুন, এখন মনে হয়, যদি হ্যারি পটারের ওই ড্রেসটা, যা পরলে নাকি অদৃশ্য হওয়া যায়, তা পেলে, আমার থেকে বোধ করি বেশি খুশি আর কেউ হতো না৷ তবে বিধাতা বোধ হয়, অন্যরকমই কিছু লিখে রেখেছিলেন আমার জন্য, তাই সে সব অসম্ভব কিছু আর ঘটেনি৷ ফার্স্ট ইয়ার৷ জীবনের প্রথম মোবাইল ফোন৷ এই প্রথম পরিবার ছেড়ে, একা থেকে পড়াশোনা৷ সব প্রথম গুলো, একা নিজের সঙ্গেই শেয়ার করে নিচ্ছিলাম৷ আরও একটা শব্দের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচয়, খুব কাছে থেকে, তা হল ‘ক্রাশ’৷ বলতে পারো, প্রেম জাতীয় একটা হালকা..আ..আ.. একটা ফিলিংস বা ধারণা পাওয়া গিয়েছিল এই সময়ই৷ প্রথম দেখা ক্যান্টিনে৷ হাতে গিটার, পনিটেল, আর রেওয়াজি গলা৷ উফফ্, পুরো যেন ঘেঁটে গেলাম৷ এক মুহুর্তে পৃথিবী উলোট পালোট৷ ম্যায় হুঁ না-র শাহরুখের মতো কেস৷ আসতে যেতে, লাভ ইন দ্য এয়ার গোছের ফিলিংস্৷ নাহ্, এন্ডিংটা একেবারেই অন্যরকম ছিল৷ বিষয়টা যে প্রেম নয়, পুরোটাই ফানুস, মেনে নিতে একটু টাইম লেগেছিল, ওই বাচ্চা মেয়েটার৷ সেবারের পুজোটা কেমন কেটেছিল, সেটা আর নাইবা বললাম৷ প্রথম ধাক্কা তো…৷

pic4
জেগে থাকে কথা ক্যান্টিনকোণ- এবার একটু অন্য গপ্প করা যাক তোমাদের সঙ্গে৷ একেবারেই শোনা সত্যিকারের গল্প৷ আমাদের চারপাশের অনেক প্রেমের গল্পেরই শুরু বিভিন্ন ক্যান্টিন থেকে৷ এই ক্যান্টিন যেন এই রোগের আঁতুড়ঘর৷ এ নেশার এক জম্পেশ আস্তানা৷ নেশাই বলা যায়৷ এ নেশার ঘোর যতদিন আছে ততদিন যেন মন কোমায় থাকে৷ কি করছে, কি বলছে, কি ঘটছে চারপাশে, কি যায় আসে৷ মন তখন পাখনা মেলে অনুসরণ করে চলেছে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য৷ হাজার ভিড় ঠেলে, ‘ফাইট কোনি ফাইট’ বলে, দে ঝাঁপ৷ খানিক হাবু-ডুবু, খানিক জল খেয়ে, পেট ফেঁপে, ফাইনালি ‘দে মা আমায় পাগল করে’ অবস্থা৷
অঙ্ক ১- এমনই ঘটেছিল নিখিলের জীবনে৷ এম.এ ফার্স্ট ইয়ারে, কলেজ ক্যান্টিনে তার দেখা হয় রুবি রায়-এর সঙ্গে৷ হাজার ভিড়ের মধ্যে ছোট্ট টিপ, হালকা লিপস্টিক, কালো শাড়ির রুবি রায়৷ রুবি রায়-ই বললুম৷ যে সব কেস ‘আজও আছি, থাকবো প্রতীক্ষায়’ গোছের, সেখানে নায়িকাকে রুবি, অনামিকা, রাজশ্রী বলে সম্বোধন করাই ভালো৷ তা এই রুবি রায়ের মনের কাছাকাছি পৌঁছনোর জন্য প্রায়ই নিখিল মনে মনে লম্বা স্পিচ আর শ্যাডো প্র্যাকটিস চালিয়ে যেত৷ এভাবেই কেটে গেল প্রায় মাস তিনেক৷ এল পঞ্চমী৷ কলেজ হয়ে ছুটি হব হব করছে৷ দুপুর তখন মেরেকেটে আড়াইটে হবে৷ পুজোর আগে আজ ইসপার ইয়া উসপার করেই ফেলবে নিখিল৷ মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করেই ফেলল, ক্লাসের লেকচার শুনতে শুনতে৷ তিনটে বাজতে না বাজতেই জামার হাত-টাত গুটিয়ে, জেন্টস্ টয়লেটের আবছা আয়নায়, একবার মুখ দেখার চেষ্টা করে, নিখিল বেরিয়ে পড়ল, মিশন প্রেম আমার-কে সফল করতে৷ সঠিক সময়ে হাজির সে ক্যান্টিনে৷ কি ব্যাপার এই সময়েই তো আসে রুবি৷ চলে যায় আরও বেশ কিছুটা সময়৷ দেখা না পাওয়ায়, ক্রমশই অস্থির হয়ে ওঠে নিখিল৷ শেষে, আর ধৈর্য্য রাখতে না পেরে, হাঁটা দেয়, ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের দিকে৷ মানে, রুবির ডিপার্টমেন্ট৷ গুচ্ছ মেয়ের মধ্যে সে খুঁজে বেড়ায় রুবিকে৷ না, সে নেই, কোত্থাও নেই৷ একবার ক্যান্টিন, একবার নিমু-দার চায়ের দোকান, একবার ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট, বার কয়েক পাক খেয়েও দেখা পেল না তার৷

pic5
অঙ্ক ২- অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এক সপ্তাহ পরে সে খোঁজ পেল রুবির৷ সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটে৷ একটা বা দুটো ছবি নয়, তাঁর রুবি রায়-এর সদ্য আপলোড করা আস্ত একটা অ্যালবাম৷ তখন তার থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না নিখিল৷ পাগলের মতো রুবির একের পর এক ছবিতে ক্লিক করে চলেছে সে৷ আর গলার কাছে একটা চিনচিনে ব্যাথা ক্রমশই ধাক্কা দিচ্ছে তাকে৷ নিচে লেখা রুবি ওয়েডস্ নীরজ৷ এন.আর.আই পাত্রের সঙ্গে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে মাত্র দেড় মাসের পরিচয় রুবির৷ তারপর জোরালো প্রেম৷ আর সেখান থেকে ‘চট মঙ্গনি পট বিবাহ’৷ আর শেষে বিদেশ পাড়ি৷
অঙ্ক ৩- এরপর কেটে গিয়েছে একটা বছর৷ এখন সেকেন্ড ইয়ার৷ আজ আরও একটা পঞ্চমী৷ ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে হাঁটছিল নিখিল৷ গুচ্ছ ভিড়ের মধ্যে কাওকে কি খুঁজছিল নিখিলের চোখ দুটো?
প্রেম আনলিমিটেড টু আলটিমেট- প্রেম বিষয়টা অনেকরকমভাবে দেখা যেতে পারে৷ কারও কাছে ‘আপন হতে বাহির হয়ে’ প্রেম বিতরণই মূল লক্ষ্য, কেউবা ইনবর্ন দেবদাস, কেউ আবার অনেষ্বণেই খুঁজে পায় জীবনের আসল মানে৷ আমাদের পাড়ার মেজো-দার কেসটাই ধরো৷ আসল নাম মৃত্যুঞ্জয়৷ তা এই মেজো-দার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, প্রেম নিবেদন৷ না পাত্রী নিয়ে বিশেষ বাছবিচার নেই তার৷ প্রেম নিবেদনের পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য যেন রয়েছে আস্ত এক ল্যাবরেটরি৷ কোন তরকারিতে কি ফোড়ন দিলে, পঞ্ছী ধরা দেবেই, তা নিয়ে তাঁর বিস্তর পড়াশোনা৷ যদিও আজ পর্যন্ত কোনটারই শিকে ছেঁড়েনি, কিন্তু মেজো দার উত্সাহে ভাটা পড়েনি এতটুকু৷ তা এই মেজো দা ঠিক করল, আর প্রেম বাই চান্স নয়, পুজোতে ভালো মেয়ে দেখে একটা সিরিয়াস প্রেম করতেই হবে৷ যেমন ভাবা, তেমন কাজ শুরু৷ গোপাল বড় সুবোধ বালক ইমেজ তৈরি করতে মেজো দা পৌঁছে গেল পাড়ার সেরা সেলুনে৷ গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে মেজো দা তখন মৃত্যুঞ্জয়৷ আর দেখে কে৷ এ যাবৎ ডজন ডজন ব্যর্থ প্রেম করে মেজো দা-র আবার পছন্দ-অপছন্দেরও একটা ব্যাপার তৈরি হয়েছে৷ তা অষ্টমীর সন্ধ্যেতে বাবু সেজেগুজে হাজির হলেন পাড়ার সবথেকে গ্ল্যামারাস পুজোমন্ডপে৷ প্রতি পুজোতে নতুন মুখের আনাগোনাই এই পুজোর আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে অনেকটাই৷ এবারও তার ব্যতিক্রম নয়৷ লাল, নীল, সবুজের মেলায়, চোখ যেন ঝলসে যায়৷ মেজো দা-র এবার তুরুপের তাস নীলখামে ভরা সুগন্ধি মাখানো চিঠি৷ জয় মা দুগ্গা বলে এবার ঝাঁপিয়ে পড়তেই হবে৷ ভিড়ের মধ্যে মেজো দা এগিয়ে গিয়েই ব়্যান্ডম একটি মেয়ের হাতে গুঁজে দিল চিঠিটা৷ তারপর আর ত্রিসীমানায় দেখা নেই তার৷

pic6
নাহ্, মেজো দা-র এই ভাবনা চিন্তাহীন ব়্যান্ডম কাজ এবার আর ব্যর্থ হয়নি৷ জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুঃসাহসিক কাজটিতে দেবী দুর্গা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মেজো দা-র৷ চিঠি গুঁজে দেওয়া সেই মেয়েটি, আজ মৃত্যুঞ্জয়ের বসাকের স্ত্রী, নীরা বসাক৷ পুজোর মধ্যে নিজের প্রেম, নীরাকে হঠাত-ই খুঁজে পাওয়া৷ মেজোর গল্পের মধ্যে সেরকম চমক বা ট্যুইস্ট না থাকলেও, একটা মোরাল আছে, আর সেই কারণেই এই প্রসঙ্গ টেনে আনা৷
পড়াশোনা, খাওয়া দাওয়া, চাকরি সবই চলবে বস্, কিন্তু প্রেমটাকে অবহেলা করলে, শেষে হাত কামড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায়ই থাকবেনা৷ প্রেম নিঃশব্দে এসে চলে যাবে নিঃশব্দেই৷ অষ্টাদশী মেয়ের ক্রাশ, অথবা নিখিলের হতাশা নয়, থাকতে হবে মেজো দা-র মতো সাহস৷ তবেই না মধুরেন সমাপয়েত্৷ জানি না কতটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারলাম৷ হয়তো কিছুটা হ য ব র ল-ই হয়তো লিখলাম৷ ক্যাম্পাস তো, এটুকু মন খুলে বলাই যায়, কি বলুন?
পুজোয় ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন৷

সব গল্প এবং ঘটনা কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে কোনও মিল থাকলে তা একেবারেই কাকতালীয়।