ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কি শত্রুতার?

1457

মুঘল বাদশাহ আলমগীর তাঁর পুত্রের জন্য একজন গৃহ শিক্ষককে নিয়োগ করেছিলেন৷ একদিন তিনি খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন শাহজাদা পাত্র থেকে জল ঢালছেন আর শিক্ষক নিজের হাত দিয়ে পা ধুয়ে নিচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে বাদশাহ ঐ শিক্ষককে ডেকে পাঠান। বাদশাহ’র আদেশ পেয়ে শিক্ষক তখন ভয়ে কাঁটা। তিনি প্রথমে ভাবলেন বাদশাহ’র সন্তানকে দিয়ে পায়ে জল ঢালিয়ে না জানি তিনি কত বড় স্পর্ধার কাজ করে ফেলেছেন! কিন্তু পরক্ষণেই তার আত্মমর্যাদা বোধ জেগে উঠে। পরদিন তিনি মাথা উঁচু করেই বাদশাহ’র সামনে হাজির হন। কিন্তু তিনি যা ভেবে গিয়েছিলেন হল তার উল্টোটাই। বাদশাহ শিক্ষককে তিরস্কার করে বললেন যে, আপনার কাছ থেকে আমার সন্তানতো কোনও আদব-কায়দাই শিখল না! এ কেমন শিক্ষা দিলেন যে আপনার ছাত্র আপনার পায়ে জল ঢেলে দেবে আর আপনি আপনারই হাত দিয়ে পা পরিষ্কার করবেন? আপনি তাকে এমন শিক্ষা দিলেন না কেন যেন সে নিজেই নিজের হাত দিয়ে আপনার পা ধুয়ে দেয়? একজন ছা পোষা শিক্ষকের প্রতি বাদশার এত বড় সম্মান প্রদর্শনে অভিভূত তখন ওই শিক্ষক৷একজন শিক্ষকের স্থান মা বাবার পরেই৷যুগ যুগ ধরে এটাই আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতির ঐতিহ্য৷ কিন্তু সেই ঐতিহ্য কতটা ধরে রাখতে পেরেছি আমরা?

প্রতিবেদন: তারক ভট্টাচার্য
প্রতিবেদন: তারক ভট্টাচার্য

নিজের স্কুল জীবনের কথাগুলো একবার ভাবুন তো৷ নিশ্চয় আপনার স্কুল জীবনে আপনি এমন কোনও বা একাধিক শিক্ষককে পেয়েছেন যাঁকে আপনি এবং আপনার সহপাঠীরা যমের মতো ভয় পেতেন৷ তিনি ক্লাসে ঢোকা মাত্রই পিনড্রপ সাইলেন্স৷ একতলায় দাঁড়িয়ে তিনি গলা ছেড়ে হাঁক দিলে গোটা স্কুলবাড়িটাতেই যেন নেমে আসত মুহূর্তের স্তব্ধতা৷ কিশোর বয়সের সেই রাগী মাস্টারমশাইকে এখন আপনি রাস্তায় দেখলে কী করবেন? রাগতস্বরে তাঁর কাছে গিয়ে কি জিজ্ঞাসা করবেন কেন ক্লাস নাইনে আপনাকে বেত দিয়ে মেরেছিলেন তিনি? নাকি নতমস্তকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলবেন ভালো আছেন স্যর, চিনতে পারেছন, ক্লাস নাইন সেকশন ‘এ’?

নস্ট্যালজিয়া হয়ত একেই বলে৷এমন সম্পর্কের রসায়ন লিখে বা বলে প্রকাশ করা যায় না৷ বরং হৃদয় দিয়ে তা অনুভব করতে হয়৷ তাই আজ যখন শিক্ষাঙ্গন রক্তাক্ত হয়৷ ছাত্র-শিক্ষক যখন সম্মুখ সমরে,তখন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সেই নষ্টালজিয়া যেন মুহুর্তের মধ্যে উবে যায়৷ কোন পক্ষ কতটা দোষী? কে কতটা সৎ? কারা কালপ্রিট? কাদের দাবি সমর্থনযোগ্য? এই সমস্ত রুটিন গা সওয়া প্রশ্নের উত্তরের পিছনে সকলেই ছুটছে৷ সন্ধে হলেই কয়েকজন তথাকথিত শিক্ষাবিদ মুখে পাউডার মেখে এবং কয়েকজন স্বঘোষিত ‘বিপ্লবী’ ছাত্র পরনে চে ঘে ভারার ছবি দেওয়া টি শার্ট পরে টিভি স্টুডিওয় বসে পড়ছেন৷ সেখানেও লজ্জার শেষ নেই৷ লাইভ অনুষ্ঠানে ছাত্র এবং শিক্ষক পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করছেন৷ বাঙালির সেই শ্রদ্ধা এবং বন্ধুত্বের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আর কত নীচে নামবে?

Teacher-final-3

এখানে শুধু বাঙালির ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের কথা বিশেষভাবে কেন উল্লেখ করলাম, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে৷ এক্ষেত্রে মহান ডেভিড হেয়ারের শিক্ষাকতা জীবনের একটি ঘটনার কথা বলতে হয়৷ উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার কথা,এদেশে শিক্ষার প্রসারে ব্রতী তথন ডেভিড হেয়ার৷আর সেই সময় হিন্দু সমাজের স্কুল পড়ুয়া ছেলেদের মাথায় এক নতুন ঝোঁক চেপেছিল৷ খ্রীষ্টান হওয়ার ঝোঁক৷ রাজধর্ম গ্রহণ করলেই যেন রাজার জাতির সম্মান পাওয়া যাবে৷ এমন ধারণা থেকেই পাদ্রীদের উস্কানিতে দলে দলে তখন বহু হিন্দু ছাত্রই রাতারাতি খ্রীষ্টান হয়ে যাচ্ছে৷ একবার হেয়ার সাহেবের স্কুলের এক ছাত্রও খ্রীষ্টান হবে বলে এক পাদ্রীর বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল৷ সেই কথা জানতে পারেন হেয়ার সাহেব৷ পাদ্রীর বাড়ি থেকে ওই ছাত্রকে কান ধরে টানতে টানতে স্কুলে নিয়ে এসেছিলেন তিনি৷ তারপর নিজের ঘরে ঢুকিয়ে বেত দিয়ে ওই ছাত্রকে এমন মার মেরেছিলেন যে সেই ছাত্রের পিঠ থেকে রক্ত ঝরেছিল৷ রাগ কমতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন হেয়ার সাহেব৷ হেয়ার সাহেবের সেই কান্না যেন আর থামে না৷ নিজের হাতে ওই ছাত্রের পিঠে ব্যান্ডেজ করতে করতে হেয়ার সাহেব বলেছিলেন ধর্ম নিয়ে ভাবনার সময় এটা নয়, এটা পড়াশোনার সময়৷ এরপর টানা দু’দিন ওই ছাত্রের সেবা করেছিলেন হেয়ার সাহেব৷ আর এই সময়ে তাঁর চোখের জল যেন থামছিলই না৷ শুধু হেয়ার সাহেব নয় বিদ্যাসাগর কিংবা ডিরোজিও’র কথা কি বাঙালিরা কোনওদিন ভুলতে পারবেন?

শুধুমাত্র মেধার জোরেই ভাল ছাত্র হওয়া যায় না৷ যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আজকের প্রেসিডেন্সি৷ শুধু বাংলা নয় সারা দেশের গর্ব এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷ যুগ যুগ ধরে উৎকর্ষতার কেন্দ্র এই কথা যেমন ঠিক৷ তেমনই যুগ যুগ ধরে যে প্রেসিডেন্সি ত্যাঁদড়ামিরও পীঠস্থান, সেই কথা অনেকেই মানবেন৷ ছাত্ররা কোনও রেজিমেন্টেড আর্মি নয়৷ তাই তাঁদের আন্দোলন নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে হবে,এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি৷ ছাত্র আন্দোলন মানেই আবেগের বিস্ফোরণ৷ কিন্তু তা বলে মহিলাদের অন্তর্বাস পড়ে আন্দোলন! ভিসি’র টেবিলের উপর উঠে নাচানাচি৷ চার অক্ষরের অশ্রাব্য গালিগালাজ৷ আবেগের দোহাই দিয়ে কি এই সবের মূল্যায়ণ করা যায়? আর যাঁরা এখনও এই ধরণের শো-কলড ছাত্র আন্দোলনকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সমর্থন করছেন তাঁরা মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে৷ ৬০-৭০ দশকের উত্তাল সময় দেখেছে প্রেসিডেন্সি৷ প্রেসিডেন্সির ছাত্র আন্দোলনকে বারবর সমীহ করেছেন বিশ্ববাসী৷ কিন্তু এ কোন আন্দোলন? ফটফট করে ইংরেজি কইয়ে, হরেকরকম্মা বিচিত্র সব সাজ পোশাকে পরিহিত সব ছাত্র, যারা ছাত্র আন্দোলনের ধ্বজাধারী৷এরা কারা? মিডিয়ার নজরে আসার জন্য দয়া করে প্রেসিডেন্সির শ্লাঘাকে বিসর্জন দেবেন না৷

presi-1

এই লেখার বিষয় শুধুমাত্র প্রেসিডেন্সি নয়৷ তবুও হাল আমলের কথা টানতে গিয়েই অনিবার্যভাবেই প্রেসিডেন্সির কথা চলে এসেছে৷ তবে শুধুমাত্র ছাত্ররাই কালপ্রিট? শিক্ষাঙ্গনের মাথার উপর থাকা ব্যক্তিরা কি একেবারে ধোয়া তুলসী পাতা? নিজের কেরিয়ারের জন্য শাসকদলের পদলেহন৷ রাজনৈতিক সমাবেশমঞ্চে উপস্থিতি৷ শাসকের ইচ্ছায় শিক্ষাঙ্গনের দেওয়ালের রং নীল সাদা করে দেওয়া৷ শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের দাদাগিরিকে ভিসির প্রশ্রয়৷মাথা নত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনুদান গ্রহণ৷ সবই তো দেখছেন রাজ্যবাসী৷ ছাত্রীকে ধর্ষণ,যৌন নিগ্রহে অভিযুক্ত শিক্ষক৷ এই ধরণের শিরোনামও খবরের কাগজের রোজনামচা৷ ফলে শুধুমাত্র ছাত্র সমাজকে কাঠগড়ায় তুলে দিলাম এবং গালমন্দ করে মনের জ্বালা জুড়োলাম৷ ব্যস কেল্লাফতে করে ফেললাম৷ বিষয়টা বোধহয় ততটাও পিঠ চাপড়ানোর মতো নয়৷ তাই মুদ্রার এক পিঠ দেখে বিচার করার অভ্যাস আমাদের ছাড়তে হবে৷