কালো ঘোমটা সরিয়ে এখন হাতের মুঠোয় ফোটোগ্রাফি

1707

প্রতি বছরের অগাস্টের ১৯ তারিখ বিশ্বজুড়ে অ্যামেচার থেকে শুরু করে পেশাদার ফটোগ্রাফাররা World Photography Day সেলিব্রেট করেন। দিনটির তাৎপর্য মাথায় রাখতে হবে। ১৮৩৭ সালে জোসেফ নাইসফোর নিপসে এবং লুই দাগেয়ার প্রথম ফটোগ্রাফির যে পদ্ধতির সূচনা করেন, তাই দাগেরোটাইপ ফটোগ্রাফি হিসেবে ক্রমে পরিচিতি পায়। তবে ব্যাপারটা জানাজানি হয় আবিষ্কারের দু’বছর পর, ১৮৩৯ সালে। যখন ফরাসি সরকার খোলাখুলি ১৯ অগাস্ট এই আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করে। সেই থেকে এই দিনটিকেই ফটোগ্রাফি দিবস হিসেবে পালিত হয়।

WorldPhotographyDay

ফোটোগ্রাফি এখন আর কোনও স্বতন্ত্র নেশা নয়। গঙ্গু তেলি থেকে শুরু আপনার স্বঘোষিত মডেল বান্ধবী- হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলে এখন সবাই ফোটোগ্রাফার। অনুঘটক হিসেবে রয়েছে বিউটি প্লাস থেকে শুরু করে পিকাসা- আর ফোটোশপ তো রয়েছেই। কিন্তু অনেকেরই শখ থাকে ছবি তোলার। আপনারও কি ছিল? পেনট্যাক্স জমানা থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে সেই ফোটোগ্রাফি এখন ডিজিট্যাল। ডার্ক রুম, ফ্যামিলি অ্যালবাম ছেড়ে ছবি এখন ঠাঁই পায় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের দেওয়ালে দেওয়ালে। ফিল্ম রোল ক্যামেরাকে পিছনে ফেলে এখন সকলে ঝুঁকেছেন ডিজিটাল ফোটোগ্রাফিতে। আপনিই বা বাদ থাকেন কেন?

final-2

ঠিক করেছিলেন মাঝারি দামের কোনও ডিজিটাল এসএলআর কিনবেন? তাহলে রোককে। ফ্লিপকার্ট বা অ্যামাজনে একবার ভাল করে ঢুঁ মেরে দেখুন। ডিজিটাল ক্যামেরার যা নাম আর ফিচারস, তার তুলনায় সস্তায় মিলবে আইফোন সিক্স এস। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এটাই বাস্তব। জনপ্রিয় ফোটো ওয়েবসাইট ‘ফ্লিকার’ ইউজারদের সব থেকে পছন্দের ক্যামেরা আইফোন সিক্স এস, কোনও ডিজিটাল এসএলআর, এমনকী কোনও কমপ্যাক্ট ডিজিট্যাল ক্যামেরাও নয়।

১৮৫০ সালে তোলা আব্রাহাম লিঙ্কনের দাগেরোটাইপ
১৮৫০ সালে তোলা আব্রাহাম লিঙ্কনের দাগেরোটাইপ

স্মার্টফোনের ক্যামেরা কি তবে পেশাদার ডিজিট্যাল ক্যামেরার প্রয়োজনীয়তাই ফুরিয়ে দিল? কখনওই নয়। ক্যামেরার পিক্সেল সাইজ নিয়ে যতই বিজ্ঞাপনী হইচই হোক, আসল কিন্তু ক্যামেরার সেন্সর। সেন্সর সাইজে কোনও দিনও স্মার্টফোনের ক্যামেরা ডিজিটাল ক্যামেরাকে হারাতে পারবে না। অন্তত এমনটাই মত বিশেষজ্ঞ ফোটোগ্রাফারদের। পেশাদারি ক্ষেত্রে এসএলআরকে হারাতে না পারলেও, অ্যামেচার ফোটোগ্রাফিতে কিন্তু বেশ জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন। অনেক ফোটোগ্রাফি কম্পিটিশনেই আর ক্যামেরাটা কোনও মানদণ্ড নয়। এখন তো আবার বহু সংস্থাই মোবাইল ফোটোগ্রাফি প্রতিযোগিতাও শুরু করে দিয়েছে।

final-4

বছর বাইশের এক অ্যামেচার ফোটোগ্রাফার গৌতম সেন বলছেন, “আরে, ছবি কোন মানের হবে, সেটা তো নির্ভর করছে ফোটোগ্রাফারের ওপর। লাখ টাকার ডিএসএলআর দিয়ে তোলা ছবিও খারাপ হতে পারে। আসল তো দরকার ফোটোগ্রাফির সেন্স। ছবির কম্পোজিশন, লাইটের সেন্স থাকলে পাঁচ হাজার টাকার ক্যামেরাতেও অ্যাওয়ার্ড জেতা ছবি তোলা যায়।”

 যুক্তিটা কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। ২০১১ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে কারোস দ’র জেতা ইরানি চিত্র পরিচালক জাফর পনাহির ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’ তো আই ফোনেই তোলা। মানের কথা ছেড়ে দিন, দামের দিক থেকেও সস্তা স্মার্টফোনের ক্যামেরা। শুধু দাম নয়, প্রয়োজনীয়তার দিক থেকেও এসএলআর-কে কয়েক গোল দেবে স্মার্টফোন ক্যামেরা। ক্যামেরা নিয়ে বেরোতে আর আলাদা করে মনে রাখতে হবে না। ফোন তো আপনি এমনিই নিয়ে বেরোচ্ছেন। আবার তোলা ছবি সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক বা ট্যুইটারে আপলোড করে দিতে পারেন। যেটা কোনও ভাবেই পেশাদার কোনও ক্যামেরায় সম্ভব নয়। মোবাইল ক্যামেরা না থাকলে হয়তো ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ শব্দটাই আসত না।

final-7

এ সব যুক্তি কিন্তু অনেকেই একেবারে মানতে চান না। “ধুর, মোবাইল ক্যামেরায় আবার ফোটোগ্রাফি হয় নাকি? হ্যাঁ, হঠাৎ কোনও ছবি তোলার কাজ চালিয়ে দিতে পারে মোবাইল। কিন্তু ওই পর্যন্তই,” উত্তর আর এক জেন ওয়াই সদস্য সুদীপের। ক্যানন ডিএসএলআর-য়ের গর্বিত মালিক যোগ করলেন, “মোবাইল ক্যামেরায় কেউ ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি করে দেখাক তো।” কিন্তু শুভদীপের চ্যালেঞ্জ কি সত্যিই অপরাজেয়? মোবাইল ফোনের ক্যামেরা যতই আট কি বারো মেগা পিক্সেল হোক, যতই লেন্স ভাল হোক, তা দিয়ে পেশাদার ফোটোগ্রাফি করা যাবে না?

“দেখুন, এক এক কাজের এক এক হাতিয়ার। প্রতিদিনের ছবি তুলতে চাইলে মোবাইল ফোন ঠিক আছে। কিন্তু সেটা দিয়ে পেশাদার পর্যায়ের ফোটোগ্রাফি করার চেষ্টা করা তো হাস্যকর। অপটিক্যাল জুম নেই, ম্যাক্রো লেন্স নেই, টেলি লেন্স লাগানো যাবে না। ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি তো অসম্ভব,” জানালেন এক পুরস্কার প্রাপ্ত পেশাদার ফোটোগ্রাফার।

তা যে যাই বলুক না কেন, আপনি তো জানেন, মা-বাবা হাতখরচের জন্য যে টাকাটা দেয়, সেই টাকা জমিয়ে ডিএসএলআর কেনা যায় না। তাই ভরসা বলতে হাতের স্মার্টফোনটিই। সেই ফোনেই বাজিমাৎ করে চমকে দিন তো সকলকে। কী করে ভাল ছবি তুলবেন স্মার্টফোনে।

final-1

আপনার জন্য রইল কয়েকটি টিপস-

  • ভাল করে ফোনের ম্যানুয়াল পড়ে জেনে নিন, মোবাইলের ক্যামেরার শাটার কখন ওঠে (পোশাকি ভাষায় শাটার ল্যাগ)। জেনে নিন ট্যাপ করার সময়, না বাটন থেকে আঙুল তোলার সময় শাটার অন হয়। আই ফোনে কিন্তু দ্বিতীয়টা হয়।
  • প্রথমেই ক্যামেরা সেটিংসে সব থেকে বড় রেসোলিউশন সিলেক্ট করুন। প্রিন্ট নেওয়ার সময় দরকার পড়লে ক্রপ করে নেবেন।
  • সরাসরি সূর্যের আলোর দিকে ফোকাস করে ছবি তুলবেন না। সব সময় আলোর উৎসকে পিছন দিকে রাখবেন।
  • ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে যদি অনেক কিছু (ম্যাক্রোস) থাকে, তা হলে ফোনকে ছবির সাবজেক্টের খুব কাছে নিয়ে যান।
  • ভুলেও কখনও ফোনের ডিজিটাল জুম ব্যবহার করবেন না। ডিজিটাল জুম করলে হাতের কাঁপুনি ছবিকে সাঙ্ঘাতিক ব্লারড করে দেবে।
  • সময় পেলেই প্যানিং আর প্যানোরোমা প্র্যাকটিস করুন। প্রথম বারেই অসাধারণ প্যানোরোমা তোলার আশা করবেন না।

final-11

এ তো গেল ছবি তোলার সাত সতেরো। কিন্তু এডিটিং বলেও তো একটা ব্স্তু আছে রে বাবা। ছবি না হয় তুললেন, কিন্তু সেটাকে পালিশ না করলে সে তো আর চকচক করবে না। তাই এই অ্যাপস চাই-ই-চাই।

  1. বিউটি প্লাস: এক কথায় কাজের অ্যাপস। অল্প আলোয় তোলা ছবিতে দেখতে কালো লাগছে- এতে একবার এডিট করে দেখুন। স্কিন টোন থেকে শুরু করে চোখের পাতা পর্যন্ত নিখুঁত এডিট করতে এই অ্যাপসের জুড়ি মেলা ভার।
  2. স্ন্যাপসিড: পছন্দমতো ফিলটার এফেক্টস আর ফ্রেমের সঙ্গে বাড়তি পাওনা ‘সিলেকটিভ এডিটিং’, মানে ছবির কোনও একটা বিশেষ অংশ এডিট করতে পারবেন, অন্য অংশকে একই রকম রেখে।
  3. ক্যামেরা প্লাস: ফোন বিশেষজ্ঞদের মতে আইফোন বা আই পডে এই অ্যাপস থাকা চাই-ই-চাই। এর সাহায্যে ফোকাস আর এক্সপোজার পছন্দমতো ঠিক করে নেওয়া যাবে, যেটা ডিফল্ট ক্যামেরা অ্যাপসে সম্ভব নয়।
  4. ইনস্টাগ্রাম: ফোন যাই হোক না কেন, এই অ্যাপস ফোনে থাকতেই হবে। বিনা পয়সায় নানা ফিল্টার আর এফেক্টসের অ্যাপস আর পাবেন না।
  5. ফোটোরুম: উইন্ডোজ ফোনের জন্য একমাত্র এই অ্যাপসটার নাম উল্লেখ করা যায়। ইনস্টাগ্রামের মতো সুবিধা না পেলেও, ছবিকে আরও সুন্দর করে তুলতে এই অ্যাপস ফোনে রাখতেই হবে।
  6. ফোটোসিন্থ: সব ফোনে তো আর ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরোমার ব্যবস্থা নেই। তখন কাজে আসবে ফোটোসিন্থ। অনেক ছবিকে জুড়ে দিব্যি বানিয়ে দেবে আপনার পছন্দসই ‘প্যানোরোমা’।

final-13

 কভার স্টোরি বিভাগে সব প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন-

ভারতীয় সেনার ঈর্ষণীয় নয়টি কমান্ডো বাহিনী

বিটনুন আর চুরমুরের গল্প বল, বন্ধু চল

স্বদেশি আন্দোলনের ভিত্তিতে বাঙালির ব্যবসা

রাজনীতিতে বন্ধু

হে নবীন, ভুলেও কখনও স্বপ্ন দেখো না!